তৃণমূলের অন্দরে ‘সই জাল’ বিতর্ক – বহিষ্কারের রাজনীতি ও বিরোধী শিবিরের গভীর সঙ্কট

সদ্যসমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনের পর বঙ্গ রাজনীতিতে বড়সড় রদবদল ঘটেছে। শাসক থেকে বিরোধী আসনে বসেছে তৃণমূল কংগ্রেস। কিন্তু হারের রেশ কাটতে না কাটতেই দলের অন্দরে শুরু হয়েছে এক নজিরবিহীন সঙ্কট। রাজ্য বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে খোদ দলের বিরুদ্ধেই ‘সই জালিয়াতি’-র বিস্ফোরক অভিযোগ এনেছেন দুই বিধায়ক— উলুবেড়িয়া পূর্বের বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং এন্টালির বিধায়ক সন্দীপন সাহা। আর এই অভিযোগ স্পিকারকে জানানোর কয়েক মিনিটের মধ্যেই তাঁদের প্রাথমিক সদস্যপদ থেকে বহিষ্কার করল তৃণমূল। এই ঘটনা প্রমাণ করছে যে, নির্বাচনী ভরাডুবির পর ঘাসফুল শিবিরে অন্তর্দ্বন্দ্ব কোন চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে।

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা ভবন, AI generated
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা ভবন. Source: Wikimedia Commons – Wikimedia.org

বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু: বিরোধী দলনেতা নির্বাচনে ‘সই জালিয়াতি’

বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা হিসেবে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে মনোনীত করার জন্য গত ২০ মে স্পিকার রথীন্দ্র বসুর কাছে একটি চিঠি জমা দেয় তৃণমূল। দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পেশ করা সেই চিঠিতে ৭০ জন বিধায়কের সই ছিল। কিন্তু গত ২৭ মে স্পিকারের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করে ঋতব্রত এবং সন্দীপন দাবি করেন যে, ওই চিঠিতে তাঁদের সই জাল করা হয়েছে। তাঁদের দাবি, হাজিরা খাতায় করা সইকে জালিয়াতি করে বিরোধী দলনেতা ও চিফ হুইপ নির্বাচনের প্রস্তাব পাশ করানো হয়েছে।

মুখ্যমন্ত্রীর বিবৃতি এবং তৃণমূলের তড়িঘড়ি পদক্ষেপ

নবান্নে সাংবাদিক বৈঠক করে রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী যখনই প্রকাশ করেন যে, তৃণমূলের দুই বিধায়ক সই জালিয়াতির লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন, ঠিক তার কয়েক মিনিটের মধ্যেই বহিষ্কারের খাঁড়া নেমে আসে ওই দুই বিধায়কের ওপর। দলের সহ-সভানেত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য স্বাক্ষরিত চিঠিতে ইমেল ও হোয়াটসঅ্যাপ মারফত তাঁদের জানিয়ে দেওয়া হয় যে, দলবিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগে তাঁদের বহিষ্কার করা হচ্ছে। দলের মুখপাত্র কুণাল ঘোষ এই প্রসঙ্গে তীব্র আক্রমণ শানিয়ে বলেন, “মমতাদি সরকার গড়লে সব ভালো, আর আজ দল ক্ষমতায় নেই বলে সব খারাপ হয়ে গেল?”

কী বলছেন বহিষ্কৃত বিধায়করা?

বহিষ্কারের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন সন্দীপন সাহা এবং ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। সন্দীপন সাফ জানিয়েছেন, “অনৈতিক কাজ করছে এমন একটি দল থেকে নৈতিক কাজ করার জন্য আমাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এই দলে নৈতিক মানুষের কোনও জায়গা নেই।” অন্যদিকে, তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পাল্টা তোপ দেগে জানিয়েছেন, দল হারার পরেই কিছু মানুষ অন্য দলের সঙ্গে বোঝাপড়া করে নিজেদের রং বদলাচ্ছেন।

বহিষ্কৃত বিধায়ক সন্দীপন সাহা এবং ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়, AI generated
বহিষ্কৃত বিধায়ক সন্দীপন সাহা এবং ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়. Source: India Today

সিআইডি তদন্ত এবং ঘনীভূত রাজনৈতিক মেঘ

এই সই জালিয়াতির অভিযোগের ভিত্তিতে ইতিমধ্যেই তদন্তে নেমেছে রাজ্যের সিআইডি (CID)। ১৩ জন বিধায়ককে জিজ্ঞাসাবাদের পাশাপাশি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কেও তলব করেছিল সিআইডি, যদিও অসুস্থতার কারণ দর্শিয়ে তিনি হাজিরা এড়িয়েছেন।

এই ঘটনা তৃণমূলের জন্য এক অশনিসঙ্কেত। সদ্য ক্ষমতা হারিয়ে বিরোধী আসনে বসা একটি দলের বিধায়ক সংখ্যা এমনিতেই কমেছে, তার ওপর এই বহিষ্কারের ফলে বিধানসভায় তাঁদের শক্তি আরও কমে ৭৮-এ দাঁড়াল। এই ‘সই জাল’ বিতর্ক এবং বহিষ্কার পর্ব শুধু তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলার অভাবকেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে না, বরং আগামীর বঙ্গ রাজনীতিতে এক বৃহত্তর ভাঙন ও মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। দলের শীর্ষ নেতৃত্বের উচিত দ্রুত ড্যামেজ কন্ট্রোলে জোর দেওয়া, নতুবা বিরোধী পরিসরেও তাঁদের ঐক্য টিকিয়ে রাখা এক কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *