By : Supriya
Updated at : 27 july 2026
কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের পর এবার রাজনৈতিক চাপের মুখে পাঞ্জাবের শিক্ষামন্ত্রী হরজোত সিং বেইন্স। রাজ্যের একাধিক পরীক্ষা ও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রশ্নফাঁস, নকল এবং অনিয়মের অভিযোগ তুলে তাঁর পদত্যাগ দাবি করেছে বিজেপি। একই দাবিতে সরব হয়েছে কংগ্রেস এবং শিরোমণি অকালি দলও। তবে সোমবার সকাল পর্যন্ত বেইন্স পদত্যাগ করবেন—এমন কোনও ঘোষণা বা নির্দিষ্ট তারিখ সামনে আসেনি।
কেন্দ্রীয় স্তরে নিট প্রশ্নফাঁস বিতর্ক এবং ছাত্র-যুব আন্দোলনের মধ্যে ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের পর পাঞ্জাবের বিরোধীরা প্রশ্ন তুলেছে—কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর ক্ষেত্রে যে রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার কথা বলা হচ্ছে, পাঞ্জাবের শিক্ষামন্ত্রীর ক্ষেত্রেও কি একই নীতি প্রযোজ্য হবে?
বিজেপির প্রশ্ন—“পাঞ্জাবের শিক্ষামন্ত্রী কবে ইস্তফা দেবেন?”
বিজেপির মুখপাত্র প্রদীপ ভান্ডারি সরাসরি প্রশ্ন করেছেন, পাঞ্জাবের শিক্ষামন্ত্রী কবে পদত্যাগ করবেন এবং নৈতিকতার প্রশ্নে অরবিন্দ কেজরিওয়াল কবে তাঁর ইস্তফা চাইবেন।
বিজেপির অভিযোগের তালিকায় রয়েছে পাঞ্জাব স্কুল এডুকেশন বোর্ডের দ্বাদশ শ্রেণির ইংরেজি পরীক্ষা, পাঞ্জাব স্টেট টিচার এলিজিবিলিটি টেস্ট বা PSTET, কৃষি উন্নয়ন আধিকারিক নিয়োগ পরীক্ষা এবং পাঞ্জাব সাবঅর্ডিনেট সার্ভিসেস সিলেকশন বোর্ডের গ্রুপ-বি ও সম্মিলিত নিয়োগ পরীক্ষার অনিয়ম। নায়েব তহসিলদার এবং ফার্মেসি অফিসার নিয়োগ পরীক্ষায় প্রযুক্তি ব্যবহার করে ব্যাপক নকলের অভিযোগও তুলেছে দলটি।
পাঞ্জাব কংগ্রেস সভাপতি অমরিন্দর সিং রাজা ওয়ারিংয়ের দাবি, গত চার বছরে রাজ্যে ছ’টি বড় প্রশ্নফাঁসের ঘটনা ঘটেছে। তাঁর বক্তব্য, পরীক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কোনও মন্ত্রী বা শীর্ষ আধিকারিককে দায় নিতে দেখা যায়নি। কংগ্রেস মুখ্যমন্ত্রী ভগবন্ত মান এবং শিক্ষামন্ত্রী বেইন্স—দু’জনের পদত্যাগই দাবি করেছে।

ফার্মেসি অফিসার পরীক্ষায় আসলে কী হয়েছিল?
সাম্প্রতিক বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে ১৯ জুলাই বাবা ফরিদ ইউনিভার্সিটি অব হেলথ সায়েন্সেসের অধীনে আয়োজিত ফার্মেসি অফিসার নিয়োগ পরীক্ষা। পুলিশের দাবি অনুযায়ী, কিছু পরীক্ষার্থী লুকানো পেন ক্যামেরা দিয়ে পরীক্ষা শুরু হওয়ার পরে প্রশ্নপত্রের ছবি তুলে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে বাইরে পাঠিয়েছিলেন। বাইরে থাকা চক্র উত্তর তৈরি করে ব্লুটুথ ইয়ারপিস ও অন্য গোপন ওয়্যারলেস যন্ত্রের মাধ্যমে পরীক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছিল।
এই ঘটনায় পরীক্ষার্থী ও চক্রের সদস্য মিলিয়ে অন্তত ৩৫ জনকে আটক অথবা গ্রেফতার করা হয়েছে। তদন্তকারীদের প্রাথমিক বক্তব্য, পরীক্ষা শুরুর আগে প্রশ্নপত্র বাইরে যায়নি এবং এখনও পর্যন্ত কোনও সরকারি আধিকারিক বা প্রতিষ্ঠানের ভিতরের ব্যক্তির জড়িত থাকার প্রমাণ মেলেনি। ফলে পুলিশ ঘটনাটিকে পূর্বপরিকল্পিত ‘প্রশ্নফাঁস’ নয়, বরং পরীক্ষা চলাকালীন সংগঠিত উচ্চপ্রযুক্তির নকলচক্র হিসেবে দেখছে।
তবে বিরোধীদের বক্তব্য, পরীক্ষাকেন্দ্রে এত বড় নিরাপত্তার ফাঁক থেকে যাওয়াও প্রশাসনিক ব্যর্থতা। প্রায় সাত হাজার পরীক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ জড়িত একটি পরীক্ষায় পেন ক্যামেরা, ব্লুটুথ এবং ওয়্যারলেস যন্ত্র ঢুকে পড়ল কীভাবে—তার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রয়োজন।
অতীতে বোর্ড পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ
পাঞ্জাব সরকারের দাবি, বর্তমান আমলে কোনও প্রতিযোগিতামূলক নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়নি। কিন্তু ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে দ্বাদশ শ্রেণির ইংরেজি পরীক্ষা প্রশ্নফাঁসের খবরের পর স্থগিত করা হয়েছিল। সেই সময় শিক্ষামন্ত্রী হরজোত বেইন্স নিজেই উচ্চপর্যায়ের তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিলেন। ফলে ‘নিয়োগ পরীক্ষা’ এবং ‘স্কুল বোর্ড পরীক্ষা’—এই দু’টির পার্থক্য রাজনৈতিক বিতর্কে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
২০২৪ সালের কৃষি উন্নয়ন আধিকারিক বা ADO নিয়োগ পরীক্ষার ক্ষেত্রেও পরীক্ষার্থীদের একাংশ প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ তুলেছিলেন। পরীক্ষার্থীদের দাবি ছিল, পরীক্ষা হওয়ার আগেই তাঁরা মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তরে সম্ভাব্য অনিয়ম সম্পর্কে ই-মেল করেছিলেন। পাঞ্জাব পাবলিক সার্ভিস কমিশন সেই সময় অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য তথ্য অনুসন্ধান শুরু করার কথা জানিয়েছিল। অভিযোগটি চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়েছিল—এমন তথ্য সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।

ভগবন্ত মান ও বেইন্সের জবাব
মুখ্যমন্ত্রী ভগবন্ত মান সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, আম আদমি পার্টির সাড়ে চার বছরের শাসনে পাঞ্জাবে একটি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রশ্নপত্রও ফাঁস হয়নি। তাঁর দাবি, দু’টি পরীক্ষায় নকলের চেষ্টা ধরা পড়েছিল এবং সরকার দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছে।
হরজোত সিং বেইন্সও বলেছেন, ফার্মেসি অফিসারের ঘটনায় প্রশ্নপত্র ফাঁস নয়, নকলচক্র ধরা পড়েছে। পরীক্ষাটি সরাসরি তাঁর শিক্ষা দপ্তরের অধীনে ছিল না; মেডিক্যাল শিক্ষা ও সংশ্লিষ্ট বিষয় স্বাস্থ্য দপ্তরের অধীন। তবে মন্ত্রিসভার যৌথ দায়িত্ব রয়েছে বলেও তিনি স্বীকার করেছেন।
বেইন্সের তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য, তাঁর পদত্যাগে যদি শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতি হয়, তবে তিনি যে কোনও সময় প্রস্তুত। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, ভিত্তিহীন অভিযোগের মাধ্যমে পাঞ্জাবকে বদনাম করতে দেবেন না। এই বক্তব্যকে পদত্যাগের ঘোষণা হিসেবে দেখা যাবে না; তিনি কোনও তারিখও জানাননি।
কী করবে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’?
কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন করা যুব সংগঠন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা CJP-র পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেও নজর রয়েছে। সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে জানিয়েছেন, পাঞ্জাবের পরীক্ষা-অনিয়মের বিষয়টিও তাঁদের নজরে রয়েছে এবং এ নিয়ে ভবিষ্যৎ কৌশল তৈরি করা হচ্ছে।
তবে সংগঠনটি এখনও পাঞ্জাবে আন্দোলনের তারিখ, কর্মসূচি কিংবা হরজোত বেইন্সের পদত্যাগকে আনুষ্ঠানিক দাবি হিসেবে ঘোষণা করেনি। দিপকে শুধু জানিয়েছেন, তাঁরা শীঘ্রই পরবর্তী কৌশল প্রকাশ করবেন এবং পাঞ্জাবের বিষয়টিও বিবেচনা করবেন।
এখন পরিস্থিতি কোথায় দাঁড়িয়ে?
এই মুহূর্তে হরজোত সিং বেইন্সের পদত্যাগের দাবি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক পর্যায়ে রয়েছে। বিজেপি, কংগ্রেস এবং অকালি দল চাপ বাড়ালেও পাঞ্জাব সরকার পদত্যাগের সম্ভাবনা উড়িয়ে দিয়ে অভিযোগগুলিকে প্রশ্নফাঁস নয়, নকল ও বিচ্ছিন্ন অনিয়ম হিসেবে ব্যাখ্যা করছে।
তবে পরীক্ষায় নকলচক্র ধরা পড়া, পুরনো পরীক্ষাগুলিকে ঘিরে অভিযোগ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা—এই প্রশ্নগুলির নিরপেক্ষ ও প্রকাশ্য তদন্ত না হলে বিতর্ক থামার সম্ভাবনা কম। আগামী বছর পাঞ্জাবে বিধানসভা নির্বাচন থাকায় ছাত্র ও চাকরিপ্রার্থীদের ক্ষোভ এখন বড় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য: ২৭ জুলাই সকাল পর্যন্ত পাঞ্জাবের শিক্ষামন্ত্রী হরজোত সিং বেইন্স পদত্যাগ করেননি এবং তাঁর পদত্যাগের কোনও নির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা করা হয়নি। একইভাবে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ও এখনও পাঞ্জাব নিয়ে চূড়ান্ত কর্মসূচি
