Sanjay Gayen – Kolkata: সাম্প্রতিক সময়ে কলকাতা ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকার অন্যতম চর্চিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘হকার উচ্ছেদ’। শিয়ালদহ, হাওড়া বা দমদম স্টেশনের মতো ব্যস্ততম এলাকা থেকে শুরু করে নিউ মার্কেটের মতো ঐতিহ্যবাহী বাজার—সর্বত্রই জবরদখল মুক্ত করার নামে চলছে বুলডোজারের আস্ফালন। নতুন সরকারের নির্দেশে এবং রেল কর্তৃপক্ষের কড়া পদক্ষেপে রাতারাতি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে বহু মানুষের রুটিরুজির একমাত্র সম্বল। কলকাতা পুরসভাও (KMC) কড়া অবস্থান নিয়েছে; নিউ মার্কেট ও গ্র্যান্ড হোটেলের আশেপাশের হকারদের এক মাসের মধ্যে জায়গা খালি করার নোটিস ধরানো হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, সৌন্দর্যায়ন বা রাস্তা দখলমুক্ত করার নামে এই যে আচমকা ‘বুলডোজার নীতি’ প্রয়োগ করা হচ্ছে, তা কতটা মানবিক এবং যুক্তিসঙ্গত?

হাওড়া স্টেশন চত্বরে উচ্ছেদ অভিযান. Source: The Hindu
পথচারীদের হাঁটার জায়গা বা ফুটপাত দখল করে ব্যবসা করাটা অবশ্যই আইনসম্মত নয়। সাধারণ মানুষেরও দীর্ঘদিনের অভিযোগ যে, শহরের ব্যস্ততম এলাকাগুলোতে হাঁটার জো নেই। বিশেষ করে ব্যস্ত সময়ে দমদম বা শিয়ালদহ স্টেশন চত্বর কিংবা ধর্মতলার ফুটপাত দিয়ে যাতায়াত করা রীতিমতো দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। তাই এই উচ্ছেদ অভিযানে যাত্রীদের একটি বড় অংশ হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছেন এবং এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন।
তবে মুদ্রার অন্য পিঠটাও সমানভাবে বিবেচ্য। এই হকাররাই কিন্তু তৃণমূল স্তরের অর্থনীতির অন্যতম বড় চালিকাশক্তি। আন্তর্জাতিক হকার দিবসে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সোশ্যাল মিডিয়ায় এই বিষয়টিতেই জোর দিয়েছেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, হকাররা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় সস্তায় নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস পৌঁছে দেন। হঠাৎ করে বুলডোজার দিয়ে দোকান ভেঙে দেওয়া মানে শুধু একটা কাঠামোর পতন নয়, বরং একটি পরিবারের মুখে লাথি মারা। তৃণমূল কংগ্রেসের বিধায়করা ইতিমধ্যেই এই উচ্ছেদ এবং বুলডোজার নীতির প্রতিবাদে রাজ্য বিধানসভার ভেতরে প্ল্যাকার্ড হাতে বিক্ষোভে সামিল হয়েছেন।

কলকাতার রাস্তায় হকারদের স্টল. Source: The Hindu
একটি আদর্শ এবং পরিকল্পিত শহরের লক্ষ্য কখনোই হকারদের সম্পূর্ণ উচ্ছেদ করা হতে পারে না, বরং তাঁদের সঠিক পুনর্বাসনের মাধ্যমে মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনা উচিত। ২০১৪ সালের ‘স্ট্রিট ভেন্ডরস অ্যাক্ট’ (Street Vendors Act) অনুযায়ী, পথচারীদের অধিকার এবং হকারদের জীবনধারণের অধিকার—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা প্রশাসনের দায়িত্ব। বিকল্প বাজারের ব্যবস্থা না করে বা পুনর্বাসন না দিয়ে রাতারাতি বুলডোজার চালিয়ে দিলে হকাররা কোথায় যাবেন?
সরকার বদল হলেও, সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের অধিকার বদলায় না। জবরদখল হটানো প্রয়োজন, কিন্তু তার পদ্ধতি হওয়া উচিত আইনি ও মানবিক। হকারদের সঙ্গে আলোচনা করে, নির্দিষ্ট ভেন্ডিং জোন তৈরি করে এবং বিকল্প আয়ের রাস্তা সুনিশ্চিত করেই এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব। অন্যথায়, তিলোত্তমার রাস্তা হয়তো পরিষ্কার হবে, কিন্তু তার জন্য হাজার হাজার অসহায় মানুষের দীর্ঘশ্বাসের মূল্য চোকাতে হবে সমাজকেই।
