কুমোরটুলির মাটি-সঙ্কট – প্রশাসনিক জটিলতায় কি বিপন্ন বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব?

Sanjay Gayen – Kolkata : দুর্গাপুজো আসতে আর মাত্র কয়েক মাস বাকি। রথযাত্রার আগে থেকেই কুমোরটুলির অলিগলিতে কাঠামো তৈরি আর খড় বাঁধার চেনা ব্যস্ততা শুরু হয়ে যায়। অথচ, এবারের ছবিটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। রবীন্দ্র সরণি থেকে বনমালী সরকার স্ট্রিট—কোথাও মৃৎশিল্পীদের সেই চিরপরিচিত কর্মব্যস্ততা নেই, চোখে পড়ছে না মাটির স্তূপ। কারণ একটাই, প্রতিমা তৈরির প্রধান উপকরণ ‘মাটি’-র তীব্র আকাল। মাটির অভাবে কার্যত থমকে গিয়েছে কুমোরটুলি। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি না হলে, পুজোর কাজ পুরোপুরি মুখ থুবড়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন খোদ মৃৎশিল্পীরা।

অভাবনীয় এই সঙ্কটের নেপথ্যে উঠে আসছে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক টানাপোড়েনের এক জটিল চিত্র। কুমোরটুলি মৃৎশিল্পী সমিতির কথায়, এতদিন দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিভিন্ন এলাকা (যেমন— ফলতা, বিষ্ণুপুর, ক্যানিং বা ডায়মন্ড হারবার) থেকে মাটি সরবরাহের রাশ ছিল তৃণমূলের দালাল চক্রের হাতে। বর্তমানে সেই সরবরাহকারীদের অনেকেই বেপাত্তা। অন্যদিকে, বিজেপির পক্ষ থেকে দাবি তোলা হচ্ছে যে— চালান কেটে সম্পূর্ণ বৈধ পথেই মাটি আনতে হবে। আক্ষেপের বিষয় হলো, দশকের পর দশক ধরে যে বেআইনি পথে মাটি সরবরাহ হয়ে আসছিল, সে বিষয়ে সম্পূর্ণ অন্ধকারে ছিলেন খোদ মৃৎশিল্পীরাই। এখন হঠাৎ করে নিয়মকানুনের কড়াকড়ি এবং রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মাঝে পড়ে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন তাঁরা।

কুমোরটুলির মৃৎশিল্প কেবল একটি বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড নয়, এটি বাংলার দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই শিল্পের সঙ্গে কয়েক হাজার মানুষের রুটি-রুজি প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে রয়েছে। বর্তমান এই অনিশ্চয়তার জেরে শিল্পীদের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, দ্রুত সমাধান না মিললে আন্দোলনের পথে হাঁটতে বাধ্য হবেন বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তাঁরা।

বেআইনি কাজ বন্ধ করে আইনি ও স্বচ্ছ পথে কাঁচামাল সরবরাহের দাবিটি নিঃসন্দেহে যুক্তিসঙ্গত। কিন্তু সেই পালাবদল বা নিয়মের গ্যাঁড়াকলের বলি যেন সাধারণ মৃৎশিল্পীরা না হন, তা নিশ্চিত করা প্রশাসনের প্রাথমিক কর্তব্য। রাজনৈতিক স্তরে দোষারোপের পালা সরিয়ে রেখে অবিলম্বে এই সঙ্কটের বাস্তবসম্মত সমাধান প্রয়োজন। স্থানীয় বিধায়ক এবং রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে শিল্পীদের যে আলোচনা শুরু হয়েছে, তা যেন কেবল ‘পিটিশন’ জমা দেওয়ার দীর্ঘসূত্রতার মধ্যেই আটকে না থাকে।

দুর্গাপুজো বাঙালির আবেগের উৎসব। উৎসবের আগে যাতে মাটি সরবরাহ অবিলম্বে স্বাভাবিক হয় এবং বৈধভাবে চালান কেটে মাটি আনার প্রক্রিয়াটি যাতে শিল্পীদের কাছে সহজলভ্য করা যায়, তার জন্য প্রশাসনকে দ্রুত হস্তক্ষেপ করতে হবে। তা না হলে, বাঙালির প্রাণের উৎসবের ঔজ্জ্বল্য যেমন ম্লান হবে, তেমনই বাংলার ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পও এক অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হবে। মাটি নিয়ে এই কাদা ছোঁড়াছুড়ি দ্রুত বন্ধ হোক, কুমোরটুলি আবার ফিরে পাক তার চেনা ছন্দ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *