শহরের অন্যতম ব্যস্ত রেল স্টেশন পার্ক সার্কাস। সোমবার গভীর রাতে সেই স্টেশন চত্বরে যখন বুলডোজার নামল, তখন অন্ধকারের বুক চিরে শোনা গেল কেবল ভাঙচুরের শব্দ। রেলের জমি দখলমুক্ত করার নামে যে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলো, তা একাধারে প্রশাসনিক স্বচ্ছতার বার্তা দেয়, আবার অন্যদিকে জনজীবনের এক গভীর ক্ষতকেও সামনে আনে। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে গড়ে ওঠা দোকানপাটগুলো মুহূর্তে ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়ার পর আজ প্রশ্ন উঠছে—উন্নয়নের সংজ্ঞা কি কেবল জবরদখল উচ্ছেদেই সীমাবদ্ধ?

প্রশাসনিক যৌক্তিকতা বনাম মানবিক সংকটরেল কর্তৃপক্ষের দাবি, স্টেশনে যাত্রীদের ভিড় সামলানো এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য এই জমি দখলমুক্ত করা জরুরি ছিল। সূত্রের খবর অনুযায়ী, চলতি মাসের শুরুতেই ব্যবসায়ীদের উচ্ছেদের নোটিস দেওয়া হয়েছিল। প্রশাসনিক দিক থেকে দেখলে, নিয়ম মেনে করা এই অভিযানকে হয়তো ‘আইনসিদ্ধ’ বলা যায়। কিন্তু, মধ্যরাতে অভিযানের এই ‘শৈলী’ কী বার্তা দেয়? সাধারণ হকার বা ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য তাদের দোকান কেবল একটি ব্যবসার জায়গা নয়, এটি বহু বছরের টিকে থাকার একমাত্র অবলম্বন। পুনর্বাসনের কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছাড়া এভাবে তাদের রাস্তার ওপর ছুড়ে ফেলা কি উন্নয়নের কোনো মানবিক মডেল?

বুলডোজারের রাজনীতি
বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বুলডোজার এখন কেবল একটি নির্মাণ সরঞ্জাম নয়, এটি এক ধরনের প্রশাসনিক ‘চিহ্ন’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত মে মাসে তিলজলা এবং পার্ক সার্কাস এলাকাতেই উচ্ছেদ ঘিরে যে অশান্তি ও বিক্ষোভের আগুন জ্বলেছিল, তার রেশ এখনো পুরোপুরি কাটেনি। কলকাতা হাইকোর্টের উচ্ছেদ সংক্রান্ত নির্দেশ ও কড়াকড়ির আবহে রেলের এই তড়িঘড়ি পদক্ষেপ অনেককে ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, আইন রক্ষার নামে আসলে এক ধরনের ‘শক্তির প্রদর্শনী’ চলছে। হকারদের দীর্ঘদিনের অস্তিত্বকে অবজ্ঞা করে এই উচ্ছেদ অভিযান কি কেবলই রেলের জমি উদ্ধার, নাকি রাজনৈতিক অস্থিরতার বাজারে একতরফা দাপট দেখানোর মরিয়া চেষ্টা?
ভবিষ্যতের রাস্তা কোথায়?
শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও পরিকাঠামো উন্নয়নের জন্য অবৈধ দখল সরানো প্রয়োজন—এতে দ্বিমতের জায়গা নেই। কিন্তু আধুনিক নগর পরিকল্পনায় ‘উচ্ছেদ’ নয়, বরং ‘স্থানান্তর’ বা ‘পুনর্বাসন’ই হওয়া উচিত মূল চাবিকাঠি। বিশ্বের বহু শহরেই হকারদের সঙ্গে নিয়ে উন্নয়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে, যেখানে তাদের বৈধ পরিসর দিয়ে শহরের সৌন্দর্য ও জীবিকা—দুটোই সুরক্ষিত রাখা সম্ভব হয়েছে। কলকাতা কি কেবল বুলডোজারের ভয়ংকর শব্দের ওপর দাঁড়িয়ে তার ভবিষৎ নির্মাণ করবে? নাকি হকারদের জন্য একটি সুসংহত ও মানবিক নীতি প্রণয়ন করা হবে?
বুলডোজার দিয়ে দোকান ভেঙে দেওয়া সহজ, কিন্তু ভেঙে যাওয়া পরিবারগুলোর ভবিষ্যৎ জোড়া লাগানো কঠিন। উন্নয়নের চাকা ঘোরানোর সময় এটুকু মনে রাখা জরুরি যে, শহরের মূল প্রাণশক্তি কেবল ইট-কাঠ-পাথরের স্টেশনে থাকে না, তা থাকে সেই ছোট ছোট মানুষের পরিশ্রমে, যারা প্রতিদিন সকালে নিজের ছোট দোকানটি খুলে শহরের অর্থনীতির চাকা সচল রাখে। প্রশাসনের উচিত শক্ত হাতে বেআইনি দখল সরানোর পাশাপাশি, জীবিকা হারানো মানুষদের পুনর্বাসনের জন্য একটি মানবিক ও স্বচ্ছ রূপরেখা দ্রুত পেশ করা।
