গণতন্ত্রে সরকারি অনুদান বা ভরতুকির মূল উদ্দেশ্য হলো প্রান্তিক ও পিছিয়ে পড়া মানুষদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন করা। কিন্তু যখন সেই ভরতুকির তালিকায় স্বয়ং মন্ত্রীর নাম উঠে আসে, তখন তা কেবল নৈতিকতার প্রশ্ন তোলে না, বরং ক্ষমতার অপব্যবহারের এক বিপজ্জনক নজির স্থাপন করে। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় কৃষি প্রতিমন্ত্রী ভগীরথ চৌধুরীর নিজেরই মন্ত্রকের অধীনে থাকা বোর্ড থেকে প্রায় এক কোটি টাকার সরকারি ভরতুকি পাওয়ার ঘটনাটি ভারতীয় রাজনীতির নৈতিক কাঠামোর ওপর এক বড় আঘাত

‘আমিও তো চাষি’—তর্ক ও তার অসারতামন্ত্রীমহোদয় নিজের সাফাইয়ে বলছেন, তিনি ছোটবেলা থেকেই কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত এবং নিয়মানুযায়ীই এই ভরতুকি নিয়েছেন। ২০১৮ সালে আবেদনের কথা বলে তিনি দাবি করেছেন, এতে গোপনীয়তার কিছু নেই। কিন্তু তর্কের খাতিরে যদি মেনেও নেওয়া হয় যে তিনি নিয়ম মেনেই আবেদন করেছেন, তবুও ‘স্বার্থের সংঘাত’ (Conflict of Interest)-এর মৌলিক প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব। যে ন্যাশনাল হর্টিকালচার বোর্ডের মাধ্যমে এই অনুদান মঞ্জুর হয়েছে, পদাধিকারবলে মন্ত্রী নিজেই সেই বোর্ডের সহ-সভাপতি। অর্থাৎ, আবেদনকারী, অনুমোদনকারী এবং চূড়ান্ত সুবিধাভোগী—তিন ভূমিকাতেই তিনি নিজে। প্রশাসনিক স্বচ্ছতার চেয়ে বড় এই ক্ষমতার অবস্থান কি স্বজনপোষণের গন্ধ ছড়াচ্ছে না?
দুর্নীতির ‘নতুন সংস্করণ’ ও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতাপ্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অশোক গেহলট যে একে ‘দুর্নীতির নয়া মডেল’ হিসেবে অভিহিত করেছেন, তা অতিরঞ্জিত নয়। সাধারণ কৃষকদের সরকারি দপ্তরের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও যেখানে সামান্য ভরতুকি পেতে নাভিশ্বাস ওঠে, সেখানে মন্ত্রীর প্রকল্প কয়েক মাসের মধ্যেই সরকারি শিলমোহর পেয়ে যায়। কংগ্রেস নেতা পবন খেড়া বা সিপিএম সাংসদ জন ব্রিটাসের মতো বিরোধীরা একে ‘ডাইরেক্ট ফ্যামিলি ট্রান্সফার’ (DFT) বলে যে কটাক্ষ করেছেন, তা আসলে সাধারণ মানুষের ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ। নরেন্দ্র মোদীর ‘না খাউঙ্গা, না খানে দুঙ্গা’ স্লোগানের সঙ্গে আজকের এই ঘটনা কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা আজ জনমানসে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সুশাসনের নিরিখে অসংগতিসরকারি প্রকল্পে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে ‘অফিস অফ প্রফিট’ বা ‘কনফ্লিক্ট অফ ইন্টারেস্ট’-এর ধারণাটি অত্যন্ত কঠোর হওয়া উচিত। একজন মন্ত্রী যখন সরকারি নীতি নির্ধারণের দায়িত্বে থাকেন, তখন নিজের ব্যবসা বা খামারের জন্য সেই একই দপ্তরের তহবিল ব্যবহার করা রাজনৈতিক নৈতিকতার নিরিখে কতটা সমর্থনযোগ্য? মন্ত্রী যদি নিজেকে ‘সাধারণ চাষি’ হিসেবেই দেখতে চাইতেন, তবে সরকারের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পদে থাকা অবস্থায় এ ধরনের অনুদান গ্রহণ থেকে বিরত থাকাই ছিল বিচক্ষণতার পরিচয়। এটি না করে তিনি নিজেকে সাধারণ কৃষক এবং বিশেষ ক্ষমতাশালী মন্ত্রী—এই দুই পরিচয়ের মধ্যে ধোঁয়াশা তৈরি করেছেন।
বুলডোজার দিয়ে দোকান ভাঙা যেমন উন্নয়নের মাপকাঠি হতে পারে না, তেমনি সরকারি খয়রাতি মন্ত্রীর অ্যাকাউন্টে ঢোকানোও সুশাসনের উদাহরণ নয়। ঘটনাটি কেবল আইনগত দিক দিয়ে কতটা বৈধ বা অবৈধ, তা নিয়ে তদন্ত হতে পারে। কিন্তু এর পেছনে থাকা ‘নৈতিক দেউলিয়াপনা’কে ঢাকা দেওয়া কঠিন। সরকারি ভরতুকি কোনো ব্যক্তিগত আখের গোছানোর মাধ্যম নয়—এই সহজ সত্যটি যত দ্রুত সরকার উপলব্ধি করবে, ততই মঙ্গল। এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন, যাতে সাধারণ মানুষের করের টাকা কার পকেটে যাচ্ছে এবং তার পিছনে কার অদৃশ্য হাত কাজ করছে, তা জলের মতো পরিষ্কার হয়।
