ফুটবলের সবুজ গালিচায় ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো এবং লিওনেল মেসির দ্বৈরথ এক চিরন্তন উপাখ্যান। এক গোলার্ধে একজন ব্যর্থ হলে অন্য গোলার্ধে আরেকজনের নাম ধরে স্লোগান ওঠাটা এখন ফুটবল-সংস্কৃতিরই অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গতকালের ম্যাচে পর্তুগালের হতাশাজনক পারফরম্যান্স এবং রোনাল্ডোর ‘ফ্লপ শো’-এর পর গ্যালারি থেকে ধেয়ে আসা ‘মেসি, মেসি’ স্লোগান তারই নবতম প্রমাণ। কিন্তু এই টিটকিরি ও বিদ্রুপের চেয়েও অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ ছিল ম্যাচ শেষে সিআর৭-এর পরিণত এবং তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণ।
গ্যালারির মনস্তাত্ত্বিক খেলা গতকালের ম্যাচে পর্তুগিজ মহাতারকাকে তাঁর চেনা ছন্দে পাওয়া যায়নি। প্রতিপক্ষের জমাট রক্ষণের সামনে বারবার খেই হারিয়েছে পর্তুগালের আক্রমণভাগ। আর এই সুযোগটাই কাজে লাগিয়েছে গ্যালারির একাংশ। রোনাল্ডোকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করতে তাদের মোক্ষম অস্ত্র ছিল চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর নাম ধরে উল্লাস। অতীতে এমন পরিস্থিতিতে রোনাল্ডোকে মেজাজ হারাতে বা উদ্ধত অঙ্গভঙ্গি করতে দেখা গেছে। কিন্তু গতকাল তিনি ছিলেন ব্যতিক্রমী রকমের শান্ত। বিদ্রুপের জবাব রাগে নয়, তিনি দিয়েছেন ক্ষুরধার যুক্তিতে।

কোথায় আটকে আছে পর্তুগাল? ম্যাচ শেষে সংবাদমাধ্যমের সামনে রোনাল্ডো কোনো রাখঢাক না করেই দলের আসল দুর্বলতার জায়গাগুলো চিহ্নিত করেছেন। তাঁর কথায় স্পষ্ট, পর্তুগাল জাতীয় দলের বর্তমান সমস্যা শুধু একজন বা দুজনের অফ-ফর্ম নয়; বরং সমস্যা লুকিয়ে আছে দলের কৌশলগত কাঠামোতে (Tactical structure)।
রোনাল্ডোর মন্তব্যের সূত্র ধরে গতকালের ম্যাচটি বিশ্লেষণ করলে তিনটি মূল ঘাটতি চোখে পড়ে: ১. মাঝমাঠ ও ফরোয়ার্ড লাইনের সংযোগহীনতা: পর্তুগালের মিডফিল্ড বল পজেশন রাখতে পারলেও, ফাইনাল থার্ডে গিয়ে নিখুঁত পাস বা ‘কিলিং বল’ বাড়াতে ব্যর্থ হচ্ছে। ফরোয়ার্ডদের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ তৈরি হচ্ছে না। ২. ট্রানজিশনে ধীরগতি: প্রতিপক্ষের আক্রমণ ঠেকিয়ে দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাকে ওঠার ক্ষেত্রে দল অনেকটাই মন্থর। ফলে প্রতিপক্ষ সহজেই নিজেদের রক্ষণ গুছিয়ে নেওয়ার সময় পেয়ে যাচ্ছে। ৩. নির্ভরশীলতার চাপ: দলে তরুণ প্রতিভার ছড়াছড়ি থাকলেও, এখনো চূড়ান্ত মুহূর্তে গোলের জন্য সেই রোনাল্ডোর দিকেই তাকিয়ে থাকছে পুরো দল। বয়সের কারণে রোনাল্ডো আগের মতো একাই ডি-বক্সের বাইরে থেকে বল টেনে নিয়ে গোল করার অবস্থায় নেই; তাঁর এখন বক্সের ভেতরে সঠিক সাপ্লাই প্রয়োজন।

দর্শকদের ‘মেসি’ বলে টিটকিরি দেওয়াটা সাময়িক বিনোদনের খোরাক হতে পারে, কিন্তু রোনাল্ডো জানেন এই মুহূর্তে দলের আসল চ্যালেঞ্জ কী। সমালোচনার জবাব তিনি বরাবরই বুটের ডগাতেই দিয়ে এসেছেন। তবে পর্তুগাল যদি দ্রুত তাদের মাঝমাঠের সমন্বয়ের অভাব ও ট্যাকটিক্যাল সমস্যাগুলো সমাধান করতে না পারে, তবে টুর্নামেন্টের সামনের পথটা আরও কঠিন হবে। গ্যালারির বিদ্রুপ নয়, মাঠের ভেতরে নিজেদের কৌশলগত ব্যর্থতাই এখন পর্তুগাল দলের সবচেয়ে বড় শত্রু।
