ট্রাম্পের ‘মরিয়া’ উদ্যোগ ও মোজতবার সম্মতি—আমেরিকা-ইরান চুক্তির নেপথ্য সমীকরণ

সাম্প্রতিক বিশ্বরাজনীতিতে সবচেয়ে অভাবনীয় এবং আলোচিত ঘটনা হলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার ঐতিহাসিক সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষর। এই চুক্তির পর ইরানের নবনিযুক্ত সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লা মোজতবা খামেনেই দাবি করেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই চুক্তির জন্য ‘মরিয়া’ ছিলেন। অন্যদিকে ট্রাম্পের দাবি, ইরানই সমঝোতার জন্য উদগ্রীব ছিল। শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন ও বিশ্লেষকদের মতামতের ভিত্তিতে এই পরস্পরবিরোধী দাবির গভীরে গেলে এক ভিন্ন ভূ-রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতার চিত্র ফুটে ওঠে।

ট্রাম্প কেন ‘মরিয়া’ ছিলেন?

Source : The Guardian

খামেনেইয়ের দাবিটি একেবারে ভিত্তিহীন নয়। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালসহ একাধিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প প্রশাসনের উপর এই যুদ্ধবিরতির জন্য বহুমুখী চাপ ছিল।

হরমুজ প্রণালী ও তেলের বাজার: ইরান অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের দামে ব্যাপক প্রভাব পড়েছিল। জ্বালানি খাতের শীর্ষ নির্বাহীরা ট্রাম্প প্রশাসনের উপর চাপ বাড়াচ্ছিলেন। ট্রাম্প নিজেও অবাক হয়েছিলেন যে, ইরান কত সহজে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে।

অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও নির্বাচন: আমেরিকার আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং ট্রাম্পের নিজস্ব রাজনৈতিক এজেন্ডা (যেমন: এআই ও ক্রিপ্টোকারেন্সি) ব্যাহত হচ্ছিল এই অন্তহীন যুদ্ধের কারণে।

সুনির্দিষ্ট কৌশলের অভাব: যুদ্ধ চলাকালীন ট্রাম্পের হুটহাট সিদ্ধান্ত এবং উপদেষ্টাদের পরামর্শ এড়িয়ে চলা হোয়াইট হাউসের ভেতরেই উদ্বেগের জন্ম দিয়েছিল। কোনো সুস্পষ্ট ‘এক্সিট স্ট্র্যাটেজি’ বা যুদ্ধ জয়ের সম্ভাবনা না থাকায়, অর্থনীতিকে বাঁচাতে ট্রাম্প একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে মরিয়া হয়ে ওঠেন।

মোজতবা খামেনেই কেন মত বদলালেন?

Source : CNN

প্রথমদিকে মোজতবা খামেনেই আদর্শিক কারণ দেখিয়ে এই চুক্তির ঘোর বিরোধী ছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজ়েশকিয়ানের আশ্বাসে এবং ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্তে মত পরিবর্তন করেন। এর পেছনে মূলত কাজ করেছে ইরানের গভীর অর্থনৈতিক সংকট।

বিপুল আটকে থাকা অর্থ: চীন, ইরাক, কাতার ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশে ইরানের প্রায় ১০০ বিলিয়ন (১০ হাজার কোটি) ডলারের বেশি অর্থ আটকে রয়েছে। সমঝোতার মাধ্যমে এই বিপুল অর্থ পুনরুদ্ধারের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও অর্থনীতি: দীর্ঘদিনের মার্কিন নৌ-অবরোধ এবং তেল রফতানির উপর থাকা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ইরানের বিপর্যস্ত অর্থনীতিকে অক্সিজেন জোগাবে।

জাতীয় স্বার্থ ও ‘রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট’: প্রেসিডেন্ট পেজ়েশকিয়ান মোজতবাকে নিশ্চিত করেন যে, চুক্তিতে আমেরিকার কোনো ‘অতিরিক্ত দাবি’ মানা হয়নি এবং এতে প্রতিরোধ ফ্রন্টের (Resistance Front) অধিকার ও জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষিত থাকবে।

চুক্তির শর্তাবলি: কার কী লাভ?

এই সমঝোতা কোনো পক্ষেরই একক বিজয় নয়, বরং এটি একটি ‘উইন-উইন’ বা উভয় পক্ষের কৌশলগত ছাড়ের দলিল।

আমেরিকার প্রাপ্তিইরানের প্রাপ্তি
হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালু হওয়া (তেলের বাজার স্থিতিশীলকরণ)।মার্কিন নৌ-অবরোধ এবং তেল রফতানির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার।
ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি।বিদেশে আটকে থাকা ১০০ বিলিয়ন ডলার ফেরত পাওয়ার পথ সুগম।
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের মাত্রা হ্রাস।দেশ পুনর্গঠনে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের তহবিলের প্রস্তাবনা।

ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং মোজতবা খামেনেই—উভয় নেতাই নিজেদের দেশের জনগণের কাছে এই চুক্তিকে নিজেদের ‘বিজয়’ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। ট্রাম্পের জন্য এটি তেলের বাজারকে স্থিতিশীল করে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে স্বস্তি ফেরানোর কৌশল; আর মোজতবার জন্য এটি খাদের কিনারে থাকা অর্থনীতিকে টেনে তোলার লাইফলাইন। রিপাবলিকান শিবিরের একাংশ ট্রাম্পের সমালোচনা করলেও, বাস্তবতায় এই চুক্তি আদর্শের চেয়ে বরং দুই দেশেরই ‘অস্তিত্ব ও অর্থনীতির’ বাধ্যবাধকতা থেকে জন্ম নেওয়া এক ঐতিহাসিক আপস।

এই সমঝোতার ফলে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে, বিশেষ করে ইসরায়েল এবং আরব দেশগুলোর অবস্থানে ভবিষ্যতে আর কী কী পরিবর্তন আসতে পারে বলে আপনি মনে করেন?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *