প্রতিশ্রুতি বনাম রাজকোষের টানাপোড়েন: নতুন সরকারের প্রথম বাজেট ও ডিএ-র ‘মহাপরীক্ষা’

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আজ এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট পেশ হতে চলেছে বিধানসভায়। অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্তের এই বাজেটকে ঘিরে স্বাভাবিকভাবেই রাজ্যবাসীর প্রত্যাশার পারদ তুঙ্গে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা শিল্পের পুনরুজ্জীবনের মতো চেনা বিষয়ের পাশাপাশি এই বাজেটের সবচেয়ে বড় আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে সরকারি কর্মচারীদের মহার্ঘ ভাতা বা ডিএ (Dearness Allowance) সংক্রান্ত ঘোষণা।

রাজ্যে সরকার বদল হলেও, সরকারি কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের ডিএ আন্দোলনের ঝাঁঝ কমেনি। বরং নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নে এখন বুক বাঁধছেন আন্দোলনকারীরা। বিজেপির নির্বাচনী ‘সংকল্পপত্রে’ স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি ছিল— ক্ষমতায় এলে কেন্দ্রীয় হারে ডিএ এবং সপ্তম বেতন কমিশন কার্যকর করা হবে। সেই দিশায় মন্ত্রিসভার প্রথম দিকেই সপ্তম বেতন কমিশন গঠনের সবুজ সংঙ্কেত দিয়ে সরকার সদর্থক ইঙ্গিত দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু আসল পরীক্ষা আজ বাজেটের টেবিলে।

নতুন সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেটে কি মিলবে বকেয়া ডিএ-র সুখবর?

ডিএ আন্দোলনকারীদের মঞ্চ ‘কনফেডারেশন অফ স্টেট গভর্নমেন্ট এমপ্লয়িজ’-এর দাবি অনুযায়ী, বর্তমানে কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারীদের তুলনায় রাজ্যের বকেয়া ডিএ-র পরিমাণ প্রায় ৪২ শতাংশ। গত ১ জুন আন্দোলনকারীদের সঙ্গে বৈঠকে খোদ মুখ্যমন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছিলেন যে, বিগত সরকারের মতো “চিরকুটে ছুঁড়ে দেওয়া ডিএ” তাঁরা দেবেন না, বরং ২২ জুনের বাজেটে একটি ‘গুড নিউজ’ বা সুখবর অপেক্ষা করছে। স্বাভাবিকভাবেই আজ সেই সুখবরের প্রত্যাশায় চাতক পাখির মতো চেয়ে আছেন লক্ষ লক্ষ রাজ্য সরকারি কর্মী ও শিক্ষক শিক্ষিকারা।

একটি নতুন সরকারের পক্ষে প্রথম বাজেটেই বিশাল অঙ্কের বকেয়া ডিএ-র পুরোটা মিটিয়ে দেওয়া অর্থনৈতিকভাবে কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মনে সংশয় থাকতেই পারে। কারণ রাজ্যের রাজকোষের হাল এবং অন্যান্য সামাজিক উন্নয়নমূলক প্রকল্পের ভারসাম্য বজায় রাখা যেকোনো অর্থমন্ত্রীর পক্ষেই এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। তবে কর্মচারীদের বক্তব্যও উপেক্ষা করার মতো নয়। মূল্যবৃদ্ধির বাজারে ডিএ কোনো দয়া বা অনুদান নয়, এটি তাঁদের আইনি ও ন্যায্য অধিকার।

আজকের বাজেট কেবল কিছু অঙ্কের খতিয়ান নয়, এটি নতুন সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতারও এক বিরাট পরীক্ষা। বিগত সরকারের উদাসীনতার বিরুদ্ধে যে ক্ষোভকে পুঁজি করে এই ‘বদলের বাংলা’ তৈরি হয়েছে, সেই ক্ষোভে মলম লাগাতে এই সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ করতেই হবে। অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত কি পারবেন ৪২ শতাংশ বকেয়া ডিএ-র জট কাটিয়ে কর্মচারীদের মুখে প্রকৃত হাসি ফোটাতে, নাকি আবারও একগুচ্ছ নতুন আশ্বাসের চাদরে ঢাকা পড়বে অধিকারের লড়াই? উত্তর মিলবে আজ বিধানসভাতেই। তবে এ কথা নিশ্চিত, আজকের বাজেট প্রস্তাবের ওপর নির্ভর করছে আগামী দিনে রাজ্যের প্রশাসনিক স্থায়িত্ব ও সরকারের প্রতি কর্মচারীদের আস্থার সমীকরণ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *