তিস্তার গ্রাসে উত্তরবঙ্গ—প্রকৃতির সতর্কবার্তা ও আমাদের দায়বদ্ধতা

উত্তরবঙ্গের লাইফলাইন বা জীবনরেখা বলা হয় তিস্তা নদীকে। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে বর্ষা এলেই সেই ভালোবাসার নদীই রুদ্রমূর্তি ধারণ করছে। সম্প্রতি সিকিমে হওয়া প্রবল ও একটানা বর্ষণের জেরে কালিম্পং জেলার তিস্তা বাজার সংলগ্ন এলাকায় মাঝরাতে যেভাবে আচমকা জল ঢুকে ঘর-বাড়ি ও রাস্তাঘাট ভাসিয়ে দিল, তা আরও একবার পাহাড়ি অঞ্চলের পরিবেশগত বিপন্নতাকে সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে।

কালিম্পং সংলগ্ন এলাকায় ক্ষুব্ধ তিস্তা নদীর জলস্তর বৃদ্ধির চিত্র. Source: STRINGER / REUTERS

রবিবার ভোররাত ৩টে নাগাদ আচমকাই পাহাড়ি নদীটির জলস্তর বিপদসীমা ছাড়িয়ে লোকালয়ে আছড়ে পড়ে। সৌভাগ্যবশত, জল নামতে শুরু করায় বড় কোনো প্রাণহানির খবর মেলেনি এবং প্রশাসন দ্রুত মাইকিং করে নজরদারি চালানোয় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা গেছে। কিন্তু এই ঘটনা যে একটি সাময়িক বিপর্যয় মাত্র নয়, বরং এক দীর্ঘমেয়াদী সংকটের অশনি সংকেত, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার ও জলপাইগুড়ির বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ২০ সেন্টিমিটারের কাছাকাছি বা তারও বেশি যে লাগাতার বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে, তা তিস্তা, তোর্সা বা জলঢাকা নদীর অববাহিকায় থাকা মানুষদের জন্য চরম উদ্বেগের।

কেন বারবার এই বিপর্যয়?

১. সিকিমের আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনা: পাহাড়ি এলাকায় মেঘভাঙা বৃষ্টি (Cloudburst) এবং হড়পা বান (Flash Flood) এখন প্রায় প্রতি বছরের চেনা ছবি হয়ে উঠছে।

২. নদীর নাব্যতা হ্রাস: বিগত কয়েক বছরের হড়পা বানের জেরে তিস্তার বুকে বিপুল পরিমাণ বালি, পাথর ও পলি জমে নদীর গভীরতা কমে গেছে। ফলে সামান্য অতিরিক্ত জল এলেই নদী তা ধারণ করতে পারছে না, সহজে উপচে পড়ছে দু-কূলে।

৩. অপরিকল্পিত নির্মাণ ও পর্যটন চাপ: দার্জিলিং ও কালিম্পং আমাদের অত্যন্ত প্রিয় পর্যটন কেন্দ্র। কিন্তু নদী অববাহিকার একদম কাছাকাছি অনিয়ন্ত্রিত পরিকাঠামো নির্মাণ পাহাড়ি মাটির ধারণক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে।

সিকিমের বৃষ্টি ও তিস্তার রুদ্ররূপ

প্রশাসনের তরফ থেকে আপৎকালীন তৎপরতা প্রশংসনীয় হলেও, এখন সময় এসেছে কেবল ‘ত্রাণ ও উদ্ধারকাজ’ কেন্দ্রিক ভাবনা থেকে বেরিয়ে দীর্ঘমেয়াদী সুসংহত পরিকল্পনা করার। নদী সংলগ্ন নিচু এলাকার স্থায়ী পুনর্বাসন এবং তিস্তার নাব্যতা ফিরিয়ে আনার জন্য বিজ্ঞানসম্মত ড্রেজিং বা পলি তোলার কথা গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করতে হবে। সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মধ্যে যৌথ পরিবেশগত নজরদারি ব্যবস্থা আরও জোরদার করা প্রয়োজন।

প্রকৃতি বারবার আমাদের সতর্ক করছে। যদি আমরা এখনই পাহাড় ও নদীর ভারসাম্য রক্ষার বিষয়ে কঠোর ও বিজ্ঞানসম্মত পদক্ষেপ না নিই, তবে উত্তরবঙ্গের এই স্বর্গীয় সৌন্দর্য অচিরেই এক স্থায়ী অভিশাপে পরিণত হতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *