তামিলনাড়ুর রাজনীতির দাবার বোর্ডে যেন নতুন কোনো সিনেমার চিত্রনাট্য তৈরি হচ্ছে। দীর্ঘ নয় বছরের দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের ইতি টেনে এমডিএমকে (MDMK) জোট ছেড়ে বেরিয়ে এল ডিএমকে-র সঙ্গ থেকে। ভাইকোর নেতৃত্বাধীন এই দলটির বিদায় কেবল জোটের সংখ্যাতত্ত্ব কমিয়ে দিল না, বরং এম কে স্ট্যালিনের বর্তমান রাজনৈতিক দৈন্যদশার ছবিটিকেও আরও স্পষ্ট করে তুলল। তামিলনাড়ুর সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনের পর থেকে ডিএমকে যে অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, এই বিচ্ছেদ তাকে এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিল।‘নিঃসঙ্গ’ স্ট্যালিন কি এখন ব্যাকফুটে?নির্বাচনী ফলাফলের পর থেকেই ডিএমকে-র অন্দরমহলে অস্বস্তি ছিলই। তামিল অভিনেতা সি জোসেফ বিজয়ের নবগঠিত দল ‘তামিলাগা ভেট্রি কাজাগম’ (TVK) যেভাবে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করে সরকার গঠন করেছে, তাতে ডিএমকে-র এতদিনকার দাপট কিছুটা ম্লান হয়েছে। ভাইকোর এই দলত্যাগ যেন মরার ওপর খাঁড়ার ঘা। ডিএমকে এখন কেবল জোটসঙ্গীই হারাচ্ছে না, তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে খোদ প্রাক্তন মিত্ররাই। বিশেষ করে ‘হিন্দুত্ববাদী শক্তির সাথে আপস’ করার যে গুরুতর অভিযোগ ভাইকো তুলেছেন, তা ডিএমকে-র ধর্মনিরপেক্ষ ভাবমূর্তির ওপর বড়সড় আঘাত।

বিজেপি কি তবে অলক্ষ্যে হাসছে?
এখনই সবথেকে বড় প্রশ্ন উঠেছে—‘নিঃসঙ্গ’ স্ট্যালিন কি বিজেপির দিকে হাত বাড়াবেন? আপাতদৃষ্টিতে এই সম্ভাবনাটি অবিশ্বাস্য মনে হলেও, ভারতীয় রাজনীতির চাণক্য-নীতিতে কিছুই অসম্ভব নয়। ডিএমকে-র সাথে বিজেপির সম্পর্ক চিরকালই সাপে-নেউলে। তবে তামিলনাড়ুর এই ‘হ্যাং অ্যাসেম্বলি’ বা ত্রিশঙ্কু পরিস্থিতির সুযোগ নিতে বিজেপি মরিয়া। বিজেপির নিজস্ব শক্তি সেখানে সীমিত হলেও, তারা পর্দার আড়াল থেকে খেলা ঘোরানোর ওস্তাদ। স্ট্যালিন যদি টিকে থাকার জন্য বা ভবিষ্যতের রাজনীতির কথা ভেবে কোনো ‘চাণক্য চাল’ দেন, তবে তাতে অবাক হওয়ার মতো খুব বেশি কারণ থাকবে না। তবে ডিএমকে-র মতো দ্রাবিড়বাদী দল কি নিজেদের আদর্শ বিসর্জন দিয়ে বিজেপির সঙ্গে একই নৌকায় উঠবে? এটি একটি বড় প্রশ্ন।

ভবিষ্যৎ কোন দিকে?
ভাইকোর এমডিএমকে-র সরাসরি বিজয়ের সরকারের পাশে দাঁড়ানো এবং উপনির্বাচনে লড়তে অস্বীকার করা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, তামিল রাজনীতির বাতাবরণ দ্রুত পাল্টাচ্ছে। স্ট্যালিনের সামনে এখন দুটি পথ: হয় নতুন করে জোটের কলেবর বাড়ানো, নতুবা আরও কোণঠাসা হয়ে ‘একলা চলো’ নীতি গ্রহণ করা। ভাইকোর অভিযোগ অনুযায়ী, ডিএমকে-র অন্দরে যে ভাঙনের সুর শোনা যাচ্ছে, তা বন্ধ করতে না পারলে স্ট্যালিনের জন্য সামনে আরও কঠিন সময় অপেক্ষা করছে।রাজনীতিতে চিরস্থায়ী বন্ধু বা শত্রু বলে কিছু নেই। আজ যিনি ডিএমকে-র মিত্রতা ছাড়লেন, কাল হয়তো তিনিও নতুন কোনো সমীকরণের অংশ হবেন। কিন্তু ডিএমকে-র এই ‘নিঃসঙ্গ’ যাত্রা কেবল স্ট্যালিনের ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়, এটি দীর্ঘ কয়েক দশকের দ্রাবিড় রাজনীতির এক ঐতিহাসিক মোড়। স্ট্যালিন কি পারবেন এই ভাঙন ঠেকাতে? নাকি তামিলনাড়ু নতুন কোনো রাজনৈতিক মেরুকরণের সাক্ষী হতে চলেছে? উত্তর দেবে আগামী কিছু দিনের ঘটনাবলি।
