বালতির পাহাড়ে প্রশ্নের পাহাড়: বেহালার ঘটনা কি শুধুই অব্যবস্থা, নাকি আরও গভীর সংকেত?

রাস্তাঘাট পরিষ্কার রাখা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং নাগরিক পরিষেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া— এ সবই একটি পুরসভার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। সেই কারণেই করদাতাদের অর্থে কেনা পুরসভার সামগ্রী যদি কোনও ব্যক্তিগত কারখানা বা গুদামে বছরের পর বছর ধরে মজুত অবস্থায় পড়ে থাকে, তবে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে।

বেহালায় সম্প্রতি পুরসভার বিপুল সংখ্যক আবর্জনা ফেলার বালতি মজুত করে রাখার অভিযোগ সামনে আসতেই রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে তীব্র চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগের তির সরাসরি কলকাতা পুরসভার ১১৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর কৃষ্ণা সিংহের দিকে। উদ্ধার হওয়া বালতিগুলির গায়ে পূর্বতন প্রকল্প ‘আমাদের পাড়া আমাদের সমাধান’-এর স্টিকার থাকায় বিতর্ক আরও ঘনীভূত হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, সাধারণ মানুষের ব্যবহারের জন্য বরাদ্দ সামগ্রী দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার না করে গুদামজাত করে রাখা হয়েছিল।

আমাদের পাড়া আমাদের সমাধান’ প্রকল্পের বালতি ঘিরে নতুন বিতর্ক।
Source : Gemini

এই ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল— যদি বালতিগুলি সরকারি সম্পত্তি হয়ে থাকে, তবে সেগুলি নির্ধারিত জায়গায় ব্যবহার না হয়ে ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণে কেন ছিল? আর যদি কোনও প্রশাসনিক কারণে সংরক্ষণ করাও হয়ে থাকে, তবে তার স্বচ্ছ নথি ও হিসাব কোথায়?

কলকাতা পুরসভা বিগত কয়েক বছরে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে হাজার হাজার নতুন বর্জ্যপাত্র কিনেছে এবং বিভিন্ন এলাকায় বিতরণ করেছে। শহরকে আরও পরিচ্ছন্ন রাখার লক্ষ্যে এই ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই সামগ্রী যদি বাস্তবে মানুষের কাজে না লাগে, তাহলে প্রকল্পের উদ্দেশ্যই প্রশ্নের মুখে পড়ে।

ঘটনাটি শুধুমাত্র একটি ওয়ার্ড বা একজন জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি স্থানীয় প্রশাসনে জবাবদিহি, সম্পদের ব্যবহার এবং সরকারি প্রকল্পের বাস্তবায়ন নিয়ে বৃহত্তর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। জনগণের টাকায় কেনা প্রতিটি সামগ্রীর হিসাব জনগণের কাছেই দিতে হবে— গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার এটাই মূল নীতি।

জনগণের টাকায় কেনা সামগ্রী কেন পৌঁছল না রাস্তায়? বিতর্কে বেহালা
Source : Anandabazer.com

অভিযোগ সত্য কি মিথ্যা, তার সিদ্ধান্ত নেবে তদন্ত। কিন্তু তদন্ত যেন কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থাকে। কতগুলি বালতি ছিল, কোথা থেকে এল, কতদিন ধরে রাখা হয়েছিল এবং কার নির্দেশে রাখা হয়েছিল— এই সব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর সামনে আসা প্রয়োজন।

কারণ নাগরিক পরিষেবার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় তখনই, যখন সরকারি সম্পদ মানুষের কাজে না লেগে বিতর্কের কেন্দ্রে পরিণত হয়। বেহালার ‘বালতি-কাণ্ড’ তাই শুধু একটি রাজনৈতিক খবর নয়; এটি প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিরও পরীক্ষা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *