দিল্লির দরবারে তৃণমূলের ফাটল: আদর্শের লড়াই নাকি অস্তিত্ব রক্ষার ‘মডেল’ সন্ধান?

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভায় পালাবদলের পর এবার দিল্লির সংসদীয় অলিন্দেও তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে ভাঙনের সুর তীব্র হয়ে উঠেছে। বিধানসভার রাশ ইতিমধ্যেই আলগা হয়েছে, আর এবার খোদ রাজধানীতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সংসদীয় দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয়েছে এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন। ১৩ থেকে ২০ জন বিদ্রোহী সাংসদ বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন— এই খবরটি রাজনৈতিক মহলে জল্পনার চেয়েও বেশি এক অবশ্যম্ভাবী পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে এই মুহূর্তে মূল কৌতূহল এই ভাঙনের রূপরেখা নিয়ে নয়, বরং এর নেপথ্যের কৌশল এবং ‘মডেল’ নিয়ে। দিল্লির এই আসন্ন ফাটল কি আম আদমি পার্টির ‘রাঘব চাড্ডা মডেল’ অনুসরণ করবে, নাকি এ রাজ্যে তৈরি হওয়া ‘ঋতব্রত মডেল’-এর পথ ধরবে?

নেতৃত্বের পরীক্ষা: দিল্লির অলিন্দে ফাটল সামলে দলীয় প্রতীক ও অনুগামীদের এক সুতোয় ধরে রাখাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
Source: All India Trinamool Congress

বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, বিজেপির এই মুহূর্তে লোকসভা ও রাজ্যসভা মিলিয়ে সংসদের দুই-কক্ষেই এমন এক সংখ্যাগরিষ্ঠতা (দুই-তৃতীয়াংশ) প্রয়োজন, যা তাদের দীর্ঘদিনের এজেন্ডা তথা ‘এক দেশ, এক ভোট’ এবং সংসদীয় আসন পুনর্নির্ধারণের মতো বিলগুলো অনায়াসে পাস করাতে সাহায্য করবে। এই লক্ষ্য পূরণে তৃণমূলের বিদ্রোহী সাংসদদের সরাসরি পদ্মশিবিরে যোগদান করা অর্থাৎ ‘আপ মডেল’ কার্যকরী হতে পারে। কিন্তু অন্য একটি বড় অংশের মতে, পরিস্থিতি এতটা সরল নাও হতে পারে। বাংলার বিধানসভায় যেভাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম সামনে রেখে, তাঁকে ‘প্রধান পরামর্শদাতা’ পদের প্রস্তাব দিয়ে আসলে তাঁরই ক্ষমতাকে খর্ব করার কৌশল নেওয়া হয়েছে, দিল্লিতেও সেই ‘ঋতব্রত মডেল’ ফিরে আসার সম্ভাবনা প্রবল।

এই কৌশলের রাজনৈতিক তাৎপর্য গভীর। সরাসরি বিজেপিতে যোগ দিলে সাংসদদের ওপর ‘দলবদলু’ বা ‘লুঠেরা’ তকমা দাগিয়ে দেওয়া সহজ হয়, যা ইতিমধ্যেই বিরোধী শিবিরের বক্তব্যে স্পষ্ট। কিন্তু নিজেদের ‘আসল তৃণমূল’ দাবি করে যদি তাঁরা সংসদীয় স্তরে একটি পৃথক ব্লক তৈরি করেন, তবে তা একদিকে যেমন দলত্যাগ বিরোধী আইনের আইনি জটিলতা এড়াতে সাহায্য করবে, অন্যদিকে তেমনই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বকে সরাসরি দিল্লির মাটিতে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারবে। নাম থাকবে মমতার, কিন্তু কাজ হবে কেন্দ্রের শাসকদলের অনুকূলে— এই সমীকরণ মোদী সরকারের ‘মহিলা সংরক্ষণ’ বা ‘এক দেশ, এক ভোট’-এর মতো স্বপ্নদর্শী বিলগুলোর ক্ষেত্রে ছদ্ম-সমর্থন জোগাতে সবচেয়ে বেশি উপযোগী হতে পারে।

সুবিধাবাদের রাজনীতি: নাম মমতার, কাজ কেন্দ্রের স্বার্থে— নতুন মডেলের উত্থান।
Source : The Hindu

তৃণমূলের সংসদীয় দলে ভাঙন এখন আর ‘যদি’ বা ‘কিন্তু’-র স্তরে নেই, তা স্রেফ সময়ের অপেক্ষা। তবে এই ভাঙন ভারতের সংসদীয় রাজনীতিতে এক নতুন ধরণের সুবিধাবাদী মডেলের জন্ম দেয় কি না, সেটাই দেখার। অস্তিত্ব রক্ষা, নাকি ক্ষমতার নতুন ভরকেন্দ্রের সন্ধান— দিল্লির এই দড়িটানাটানি শেষ পর্যন্ত কোন দিকে মোড় নেয়, তার ওপরই নির্ভর করছে বাংলার শাসকদলের জাতীয় স্তরের ভবিষ্যৎ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *