ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাসে সম্ভবত এই প্রথমবার একটি নিছক ইন্টারনেট মিম বা ব্যঙ্গাত্মক সোশ্যাল মিডিয়া পেজ এক বিশাল গণআন্দোলনের রূপ নিতে চলেছে। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির একটি মন্তব্যে (যেখানে বেকার যুবসমাজকে ‘ককরোচ’ বা আরশোলার সঙ্গে তুলনা করার অভিযোগ উঠেছিল) ক্ষুব্ধ হয়ে যে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (CJP)-র জন্ম হয়েছিল, আজ তারাই দেশের বেকার ও বঞ্চিত ছাত্রসমাজের সবচেয়ে বড় কণ্ঠস্বর। আগামী ৬ জুন, ২০২৬ তারিখে দিল্লির যন্তর মন্তরে সর্বভারতীয় স্তরের এক বৃহত্তর কর্মসূচির ডাক দিয়েছে সিজেপি। মূল দাবি একটাই—সাম্প্রতিক নিট (NEET-UG 2026) এবং সিবিএসই (CBSE) পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের দায় নিয়ে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে অবিলম্বে পদত্যাগ করতে হবে। আর এই কর্মসূচির ঠিক আগে দেশে ফিরে সমর্থকদের উদ্দেশে এক কড়া অথচ শান্ত বার্তায় আন্দোলনের সুর বেঁধে দিয়েছেন সিজেপি প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে।
মিম থেকে গণআন্দোলনের জন্ম
গত ১৬ মে জন্ম নেওয়া সিজেপি-র উত্থান রূপকথার চেয়েও চমকপ্রদ। মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ইনস্টাগ্রামে তাদের ফলোয়ার সংখ্যা ২০ মিলিয়ন বা ২ কোটি ছাড়িয়ে গিয়েছে, যা দেশের শাসকদল বিজেপি বা প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের সম্মিলিত ফলোয়ার সংখ্যার চেয়েও বেশি। নিজেদের ‘বেকার, অলস এবং ক্রনিক্যালি অনলাইন’ বলে দাবি করে ব্যঙ্গের মোড়কে যে প্রতিবাদ শুরু হয়েছিল, তা আজ দেশের মূলধারার রাজনীতিকে রীতিমতো চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।

নিট কেলেঙ্কারি এবং ক্ষুব্ধ তারুণ্য
চলতি বছরের মে মাসে নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার ঘটনায় দেশজুড়ে অন্তত ২২ লক্ষ ডাক্তারি পড়ুয়ার ভবিষ্যৎ অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়েছে। সিবিএসই এবং অন্যান্য বড় পরীক্ষাগুলো মিলিয়ে প্রায় এক কোটি ছাত্রছাত্রী এই দুর্নীতির শিকার। এই পরিস্থিতিতে শিক্ষামন্ত্রকের তরফ থেকে কেবল কয়েকজন আধিকারিককে বদলি করাকে ‘আইওয়াশ’ বলে তোপ দেগেছে ককরোচ জনতা পার্টি। তাদের দাবি, গোটা ব্যবস্থার শেকড়ে পচন ধরেছে এবং এই ঘটনার সম্পূর্ণ দায় শিক্ষামন্ত্রীকেই নিতে হবে।
প্রতিষ্ঠাতার বার্তা এবং ৬ জুনের কর্মসূচি
আমেরিকায় বসেই সিজেপি পরিচালনা করা বোস্টন-প্রবাসী অভিজিৎ দীপকে ইতিমধ্যেই এই আন্দোলনে যোগ দিতে দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ৬ জুন সকালে দিল্লি বিমানবন্দরে পা রাখার আগেই তিনি একটি ভিডিও বার্তায় সমর্থকদের উদ্দেশে বলেন, “দেশের সংবিধানের পথ অনুসরণ করে আমাদের শান্তিপূর্ণভাবে পথে নামতে হবে। আমরা সবাই মিলে যন্তর মন্তরে ধর্নার অনুমতি চাইতে সংসদ মার্গ থানায় যাব।” দীপকে জানিয়েছেন যে, তাঁর পরিবার ও বন্ধুরা গ্রেপ্তারি নিয়ে আতঙ্কিত, কিন্তু তিনি গণতান্ত্রিক অধিকারে বিশ্বাসী। তাঁর এই ঘোষণায় আরও মাত্রা যোগ করেছে পরিবেশকর্মী সোনম ওয়াংচুকের মতো ব্যক্তিত্বের এই আন্দোলনে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা।

প্রমাদ গুনছে রাজনৈতিক মহল
সিজেপি-র এই বিপুল জনপ্রিয়তা দেখে প্রমাদ গুনছে দেশের মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোও। একদিকে যখন শাসকদল এই পেজের পিছনে বিদেশি মদতের তত্ত্ব খাঁড়া করে এটিকে নিষিদ্ধ করার চেষ্টা করেছে, অন্যদিকে কংগ্রেসও নিজেদের কর্মীদের নির্দেশ দিয়েছে সিজেপি-র কর্মসূচিতে পা না বাড়াতে। কংগ্রেসের আশঙ্কা, ২০১১ সালের ‘ইন্ডিয়া এগেইনস্ট করাপশন’ (আন্না হাজারের আন্দোলন) যেমন পরে রাজনৈতিক দলে (AAP) পরিণত হয়েছিল, সিজেপি-র ক্ষেত্রেও তেমন কিছু হতে পারে।

উপসংহার
আজকের দিনে (৫ জুন, ২০২৬) দাঁড়িয়ে এ কথা স্পষ্ট যে, ককরোচ জনতা পার্টি কেবল আর একটি সোশ্যাল মিডিয়া ট্রেন্ড নয়। এটি হলো ভারতের শিক্ষিত, বেকার এবং প্রতারিত তরুণ প্রজন্মের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণ। ব্যঙ্গ ও সোশ্যাল মিডিয়াকে হাতিয়ার করে তারা যে সংগঠিত প্রতিরোধের রূপরেখা তৈরি করেছে, তা আধুনিক রাজনৈতিক ইতিহাসে এক মাইলফলক। সরকার যদি এই ‘আরশোলা’দের এখনও নিছক রসিকতা বা অবহেলার চোখে দেখে, তবে তা এক ঐতিহাসিক ভুল হবে। নিট-দুর্নীতির বিচার এবং শিক্ষাক্ষেত্রে স্বচ্ছতা আনার এই দাবিকে আর এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই।
