টালিগঞ্জের সিনেমা পাড়ায় কান পাতলেই গত কয়েক বছর ধরে একটা শব্দ বাতাসে ভাসত— ‘ব্যান’ বা বয়কট সংস্কৃতি। অবশেষে সেই সংস্কৃতির অলিখিত নিয়ন্ত্রক, ফেডারেশনের প্রাক্তন সভাপতি স্বরূপ বিশ্বাসের গ্রেফতারি এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে সাংসদ-অভিনেতা দেবের বিস্ফোরক মন্তব্য টলিউডের অন্দরের এক অন্ধকার বাস্তবকে জনসমক্ষে এনে দিল। দেবের স্পষ্ট স্বীকারোক্তি— “তৃণমূল জিতলে আমাকেও ‘ব্যান’ করতেন স্বরূপ, ক্ষমাও চাইতে বলা হয়েছিল!”— প্রমাণ করে যে, শিল্পের আঙিনায় ক্ষমতার দম্ভ কতটা গভীরে শিকড় গেড়েছিল। একজন প্রথম সারির সুপারস্টার ও খোদ শাসকদলের শীর্ষ সাংসদ হওয়া সত্ত্বেও যদি দেবকে এই হুমকির মুখে পড়তে হয়, তবে সাধারণ টেকনিশিয়ান বা উদীয়মান শিল্পীদের অবস্থা কতটা শোচনীয় ছিল, তা সহজেই অনুমেয়।

Source:Anandabazar.com
টলিউডের এই সংকট নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ উঠছিল, ফেডারেশনের নামে আসলে এক ধরণের ‘সিন্ডিকেট রাজ’ চালানো হচ্ছিল। কে কাজ পাবেন, কোন পরিচালক কোন টেকনিশিয়ানকে নেবেন, তা সিনেমার সৃজনশীলতার ওপর নয়, বরং নির্ভর করত ক্ষমতার অলিন্দে থাকা গুটি কয়েক মানুষের মর্জির ওপর। অনির্বাণ ভট্টাচার্যের মতো প্রতিভাবান অভিনেতাকে প্রায় দু’বছর অলিখিত ‘ব্যান’ সহ্য করতে হয়েছে। দেবের আনা অভিযোগ আরও মারাত্মক— স্বরূপ বিশ্বাসের তৈরি করা এই ভয়ের আবহে পড়ে বহু সাধারণ টেকনিশিয়ান রুজি-রুটি হারিয়ে আত্মহত্যার পথ পর্যন্ত বেছে নিতে গিয়েছিলেন। শিল্পের স্বাধীনতাকে যখন political বা ব্যক্তিগত ক্ষমতার লাঠি দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা হয়, তখন শিল্পের মৃত্যু ঘটে। টলিউডও গত কয়েক বছরে ঠিক সেই পথেই এগোচ্ছিল, যার ফলস্বরূপ ছবির সংখ্যা এবং গুণগত মান দুই-ই তলানিতে ঠেকেছে।
তবে দেবের মন্তব্যের মধ্যে এক ধরণের রাজনৈতিক বাস্তববাদও লুকিয়ে রয়েছে। স্বরূপ বিশ্বাসকে ‘হেরে যাওয়া মানুষ’ বলে সম্বোধন করে তিনি আসলে বুঝিয়ে দিলেন, ক্ষমতার পালাবদলের সাথে সাথেই কীভাবে টলিপাড়ার সমীকরণ বদলে যায়। আজ যখন দিল্লির হস্তক্ষেপে ফেডারেশনের ক্ষমতা খর্ব করে ‘কনফেডারেশন’ গড়ার তোড়জোড় চলছে, তখন অনেকেই মুখ খুলতে শুরু করেছেন। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, এই প্রতিবাদ কি সত্যিই আদর্শগত, নাকি ক্ষমতার হাওয়া বদলের সুযোগ? যখন স্বরূপ বিশ্বাসের দাপট ছিল, তখন আর্টিস্ট ফোরাম বা অন্য সংগঠনগুলো কেন নীরব ছিল? কেন একজন অনির্বাণ ভট্টাচার্যকে একাই লড়াই করতে হলো?

Source : Anandabazar.com
টলিউডকে যদি সত্যিই বাঁচাতে হয়, তবে একে সম্পূর্ণ ‘রাজনীতিমুক্ত’ এবং ‘ভয়মুক্ত’ করা প্রয়োজন। আজ স্বরূপ বিশ্বাসের পতন হয়তো একনায়কতন্ত্রের অবসান ঘটাবে, কিন্তু যদি পুনরায় অন্য কোনো রাজনৈতিক শক্তির ছত্রছায়ায় নতুন কোনো ‘দাদাগিরি’ শুরু হয়, তবে টলিপাড়ার ভাগ্য একই থাকবে। দেব যে সাহসিকতার সাথে আজ এই ধামাচাপা সত্যটা সামনে আনলেন, তাকে পাথেয় করে টলিউডের শিল্পী ও কলাকুশলীদের এবার একজোট হতে হবে। মাথা উঁচু করে বাঁচার এই যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, তাকে কাজে লাগিয়ে টলিউড নিজের হারানো গৌরব ফিরে পাক— এটাই এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।
