By : Supriya Paul
Updated at : 14 jul 2026
বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালী (Strait of Hormuz) ঘিরে ফের আন্তর্জাতিক মহলে জোর চর্চা শুরু হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন একটি মন্তব্য করেছেন, যেখানে তিনি দাবি করেন যে হরমুজ প্রণালী দিয়ে যেসব বাণিজ্যিক জাহাজ মার্কিন সামরিক সুরক্ষার সুবিধা নিয়ে চলাচল করে, তাদের সেই নিরাপত্তার জন্য অর্থ বা শুল্ক দেওয়া উচিত।
এই মন্তব্য প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, তেল পরিবহণ এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
হরমুজ প্রণালী কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রুট। এটি পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর এবং আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহী, কুয়েত, কাতার, ইরাক এবং ইরানের মতো দেশ থেকে রপ্তানি হওয়া বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস এই পথ দিয়েই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পৌঁছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বে সমুদ্রপথে পরিবাহিত মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালী দিয়ে যায়। ফলে এখানে কোনও সংঘাত বা বাধা তৈরি হলে তার প্রভাব পড়তে পারে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে।
ট্রাম্প কী বলেছেন?
ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, মার্কিন নৌবাহিনী দীর্ঘদিন ধরে হরমুজ প্রণালীতে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তাই তাঁর দাবি, এই নিরাপত্তা ব্যবস্থার সুবিধা নেওয়া দেশ বা সংস্থাগুলির উচিত যুক্তরাষ্ট্রকে অর্থ প্রদান করা।
তিনি ইঙ্গিত দেন, যদি মার্কিন বাহিনী নিরাপত্তা প্রদান করে, তাহলে সেই পরিষেবার জন্য একটি নির্দিষ্ট ফি বা শুল্ক নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
কেন বিতর্ক তৈরি হয়েছে?
ট্রাম্পের এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
- আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালী একটি আন্তর্জাতিক জলপথ।
- বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জাহাজ আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনেই এই পথে চলাচল করে।
- অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, একতরফাভাবে কোনও দেশ এই ধরনের শুল্ক আরোপ করতে পারে কি না, তা নিয়ে আইনি ও কূটনৈতিক প্রশ্ন রয়েছে।
- অন্যদিকে, ট্রাম্প সমর্থকদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলে বিপুল সামরিক ব্যয় বহন করছে। তাই সেই ব্যয়ের একটি অংশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক সংস্থাগুলির বহন করা উচিত।

ভারতের উপর কী প্রভাব পড়তে পারে?
ভারত তার তেলের একটি বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করে। সেই তেলের বড় অংশই হরমুজ প্রণালী দিয়ে আসে।
যদি ভবিষ্যতে এই রুটে অতিরিক্ত খরচ, নিরাপত্তা জটিলতা বা কোনও নতুন নীতি কার্যকর হয়, তাহলে—
- তেল আমদানির ব্যয় বাড়তে পারে।
- আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
- জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পরিবহণ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামেও পড়তে পারে।
তবে এখনও পর্যন্ত হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের উপর নতুন কোনও বাধ্যতামূলক মার্কিন শুল্ক কার্যকর হয়নি। বিষয়টি মূলত রাজনৈতিক বক্তব্য ও নীতিগত আলোচনার পর্যায়েই রয়েছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, এই ধরনের প্রস্তাব বাস্তবায়ন করতে গেলে বহু দেশের সম্মতি এবং আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন সংক্রান্ত জটিলতা সামনে আসতে পারে। অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলে ভবিষ্যতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন আন্তর্জাতিক আলোচনা হতে পারে।
হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও ভূ-রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহণ রুট হওয়ায় এই অঞ্চলের যে কোনও নীতিগত পরিবর্তন বিশ্ব অর্থনীতি, তেলের বাজার এবং আমদানিনির্ভর দেশগুলির উপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। তবে বর্তমানে এটি একটি রাজনৈতিক প্রস্তাব বা অবস্থান; বাস্তবে এমন কোনও শুল্ক ব্যবস্থা কার্যকর হয়েছে বলে নিশ্চিত তথ্য নেই।
