দুই তৃণমূলের দুই মঞ্চে ২১ জুলাই: মমতার দিকেই আবেগের টান, ঋতব্রত শিবিরেও সংগঠিত ভিড়

সকাল পর্যন্ত কোনও সভাকেই স্পষ্ট ‘জয়ী’ বলা যাচ্ছে না; এক মঞ্চ ঘুরে অন্য মঞ্চে যাচ্ছেন বহু কর্মী-সমর্থক

By: Supriya

Updated at : 21 jul 2026

২১ জুলাই: একসময় ২১ জুলাই মানেই ছিল ধর্মতলামুখী একটিই জনস্রোত। কিন্তু তৃণমূলের ভাঙন এবং রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর এ বছর শহিদ দিবসে দেখা গেল সম্পূর্ণ ভিন্ন ছবি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন ‘কালীঘাট তৃণমূল’ বিড়লা তারামণ্ডলের সামনে ক্যাথিড্রাল রোডে সভা করছে। অন্যদিকে, বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূলের বিদ্রোহী শিবিরের সভাস্থল মেয়ো রোডে গান্ধীমূর্তির পাদদেশে। পাশাপাশি শহিদ মিনার ময়দানে আলাদা কর্মসূচি করছে প্রদেশ কংগ্রেস। প্রায় আড়াই কিলোমিটারের মধ্যেই হচ্ছে তিনটি পৃথক সমাবেশ।

কলকাতা হাই কোর্টের শর্ত মেনে মমতা শিবিরের অনুষ্ঠান দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে আড়াইটের মধ্যে করার কথা। মমতার দল ২০ হাজার মানুষের জমায়েতের অনুমতি চাইলেও আদালত সর্বোচ্চ আড়াই হাজার মানুষের উপস্থিতির অনুমতি দিয়েছে এবং গোটা রাস্তা বন্ধ করা যাবে না বলে জানিয়েছে। ঋতব্রত শিবিরও গান্ধীমূর্তির কাছে পৃথক কর্মসূচির অনুমতি পেয়েছে। ফলে দুই সভার আকার বিচার করার ক্ষেত্রে আদালতের বেঁধে দেওয়া সীমাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সকালে কোন সভার দিকে বেশি ঝোঁক?

সকাল পর্যন্ত পাওয়া ছবিতে দুই সভাস্থলেই তৃণমূল কর্মী-সমর্থকদের দেখা গিয়েছে। তবে আগের বছরগুলির মতো কলকাতার রাস্তাজুড়ে একমুখী এবং উপচে পড়া জনস্রোত দেখা যায়নি। জেলা থেকে আসা অনেক কর্মী কোন শিবিরের সভায় যাবেন, তা নিয়েও বিভ্রান্ত ছিলেন। কেউ স্থানীয় বিধায়কের সঙ্গে যে সভায় এসেছেন, সেখানেই বসেছেন। আবার অনেকের বক্তব্য, তাঁদের কাছে তৃণমূলের প্রধান পরিচয় এখনও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়; তাই মমতা যেখানে থাকবেন, তাঁরা সেখানেই যাবেন। কেউ আবার দুই সভাতেই ঘুরে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন।

মেয়ো রোডে ঋতব্রত শিবিরের সভাস্থলে উপস্থিত কয়েকজন কর্মী সংবাদমাধ্যমকে জানান, তাঁরা জায়গাটি দেখতে এলেও তাঁদের মূল গন্তব্য বিড়লা তারামণ্ডলের সামনে মমতার সভা। এক কর্মীর বক্তব্য ছিল—দলের প্রতীক এক হলেও তাঁদের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। অন্য এক কর্মী অবশ্য জানান, দুই পক্ষই তৃণমূলের দাবি করায় তিনি দু’টি অনুষ্ঠানেই যোগ দিতে চান। এই বক্তব্যগুলি থেকে মমতার প্রতি কর্মীদের একাংশের ব্যক্তিগত ও আবেগগত টান স্পষ্ট হলেও, এগুলিকে সামগ্রিক জনমতের চূড়ান্ত হিসাব বলা যাবে না।

সংগঠনে এগিয়ে থাকার চেষ্টা ঋতব্রত শিবিরের

জেলা থেকে আসা কর্মী-সমর্থকদের জন্য ঋতব্রত শিবির ডিম-ভাত এবং রাতে থাকার ব্যবস্থা করেছে। ক্ষুদিরাম অনুশীলন কেন্দ্র ও কয়েকটি গেস্ট হাউসে কর্মীদের রাখার বন্দোবস্ত করা হয়। এই ব্যবস্থাকে সামনে রেখে ঋতব্রত শিবির নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি প্রদর্শনের চেষ্টা করেছে বলে রাজনৈতিক মহলের ধারণা।

অন্যদিকে, সভার আগের রাতে মমতা শিবিরের মঞ্চ, ব্যানার এবং মাইকের সংযোগ ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠে। খবর পেয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিড়লা তারামণ্ডলের সামনে পৌঁছে রাতভর সেখানে অবস্থান করেন। তাঁর সঙ্গে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, ডেরেক ও’ব্রায়েন, দোলা সেন-সহ একাধিক নেতা ছিলেন। বিজেপির বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ তুললেও বিজেপি সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

তাহলে কর্মীরা কাকে বাছলেন?

সকাল ১১টা পর্যন্ত প্রাথমিক ছবিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সভার প্রতি কর্মীদের একাংশের আবেগগত ঝোঁক তুলনামূলকভাবে বেশি চোখে পড়েছে। তবে ঋতব্রত শিবিরেও নিজস্ব সংগঠন, নেতা এবং জেলা থেকে আসা কর্মীদের উপস্থিতি রয়েছে। দুই সভা পুরোপুরি শুরু হওয়ার আগে নির্ভরযোগ্য সংখ্যা ছাড়া কোনও পক্ষকে ভিড়ের লড়াইয়ে জয়ী ঘোষণা করা ঠিক হবে না।

এবারের ২১ জুলাই তাই শুধুমাত্র শহিদ স্মরণের কর্মসূচি নয়। তৃণমূলের নাম, প্রতীক এবং রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের প্রকৃত দাবিদার কে—মমতা না ঋতব্রত—তারও প্রকাশ্য শক্তিপরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। শেষ পর্যন্ত মঞ্চের সামনে কত মানুষ থাকলেন, কোন নেতার বক্তব্যে বেশি রাজনৈতিক সাড়া মিলল এবং জেলা সংগঠনের কতটা অংশ কোন দিকে দাঁড়াল—সেই হিসাবেই নির্ধারিত হবে এই দ্বৈরথের রাজনৈতিক ফলাফল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *