সরকারি উদ্যোগে ফ্রি বা বিনামূল্যে বাসযাত্রার প্রকল্প সাধারণ মানুষের কাছে, বিশেষ করে নিত্যযাত্রী এবং মহিলাদের কাছে এক বিপুল স্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু মুদ্রার অন্য পিঠের ছবিটা বেশ অন্ধকার। ৫ জুন, ২০২৬-এর প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে কলকাতা ও তার পার্শ্ববর্তী শহরতলির পরিবহন ব্যবস্থার দিকে তাকালে একটি স্পষ্ট বৈপরীত্য চোখে পড়ে। একদিকে সরকারি ও নির্দিষ্ট রুটের বাসগুলোতে উপচে পড়া ভিড়, অন্যদিকে রাস্তার ধারে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যাত্রীর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা সারি সারি অ্যাপ ক্যাব। জনকল্যাণমুখী এই প্রকল্পের জেরে দীর্ঘমেয়াদে এক গভীর অর্থনৈতিক সঙ্কটের মুখে দাঁড়িয়েছে অ্যাপ ক্যাব শিল্প এবং এর সঙ্গে যুক্ত হাজার হাজার চালকের রুটিরুজি।

সঙ্কটের মূলে কী?
যাতায়াতের খরচ মধ্যবিত্তের মাসিক বাজেটের একটি বড় অংশ দখল করে। বিনামূল্যে বা অত্যন্ত কম খরচে বাসযাত্রার সুযোগ পাওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই যাত্রীরা ক্যাব বা ট্যাক্সির বদলে বাসকে বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। বিশেষ করে ছোট দূরত্ব বা অফিস যাতায়াতের ক্ষেত্রে অ্যাপ ক্যাবের বুকিং তলানিতে এসে ঠেকেছে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে চালকদের আয়ের ওপর।
Gig Economy বা চুক্তিভিত্তিক অর্থনীতির অন্ধকার দিক
অ্যাপ ক্যাব চালকরা মূলত ‘গিগ ওয়ার্কার’ (Gig Worker)। তাঁদের আয়ের কোনো নির্দিষ্ট গ্যারান্টি নেই। দিনভর গাড়ি চালিয়ে যে রোজগার হয়, তা থেকেই মেটাতে হয় গাড়ির ইএমআই (EMI), জ্বালানির বিপুল খরচ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং অ্যাপ কোম্পানিগুলোর মোটা অঙ্কের কমিশন। বর্তমান পরিস্থিতিতে যাত্রী সংখ্যা এত মাত্রায় কমে গিয়েছে যে, অনেক চালকের পক্ষেই গাড়ির ন্যূনতম ইএমআই জোগাড় করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াচ্ছে। দিনের শেষে খালি হাতে বাড়ি ফিরতে হচ্ছে বহু চালককে। রোজগার না থাকায় ইতিমধ্যেই অনেকে বাধ্য হয়ে গাড়ি বিক্রি করে অন্য পেশার দিকে ঝুঁকছেন।

দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ও পরিকাঠামোগত আশঙ্কা
এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে চললে শহরের পরিবহন পরিকাঠামোয় একটি বড় শূন্যতা তৈরি হতে পারে।
- জরুরি পরিষেবায় ঘাটতি: বাস পরিষেবা নির্দিষ্ট সময় এবং রুটের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু জরুরি প্রয়োজনে, রাতে, বা বাসের রুট নেই এমন জায়গায় অ্যাপ ক্যাবই ভরসা। চালকরা এই পেশা ছেড়ে দিলে সেই সময় সাধারণ মানুষই চূড়ান্ত ভোগান্তির শিকার হবেন।
- কর্মসংস্থান হ্রাস: হাজার হাজার যুবক এই অ্যাপ ক্যাব চালিয়ে নিজেদের সংসার চালান। এই ক্ষেত্রটি ভেঙে পড়লে বেকারত্বের হার মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পাবে, যা রাজ্যের সার্বিক অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করবে।
সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা
জনকল্যাণমূলক প্রকল্প হিসেবে বিনামূল্যে বাসযাত্রা অবশ্যই প্রশংসনীয় একটি উদ্যোগ। সমাজের পিছিয়ে পড়া অংশ এতে ভীষণভাবে উপকৃত হচ্ছেন। কিন্তু সেই উন্নয়নের চাকায় পিষ্ট হয়ে যেন আরেক দল খেটে-খাওয়া মানুষের জীবন বিপন্ন না হয়, সেদিকেও নজর রাখা প্রশাসনের দায়িত্ব। অ্যাপ ক্যাব চালকদের জন্য গাড়ির ঋণের সুদে ছাড়, রোড ট্যাক্স কমানো, বা অ্যাপ কোম্পানিগুলোর কমিশনের ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ আনার মতো পদক্ষেপগুলো বিবেচনা করা প্রয়োজন। জনস্বার্থ এবং পরিবহন শিল্পের ভারসাম্য বজায় রাখতে প্রশাসনকে অবিলম্বে এক সুচিন্তিত ও বাস্তবসম্মত নীতি গ্রহণ করতে হবে। নাহলে, শহরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি পরিবহন ব্যবস্থা অচিরেই কালের নিয়মে হারিয়ে যাবে।
