By : Paushali Saha
Updated at :11 July 2026
কলকাতা আবারও ইতিহাস গড়ল। যে শহর দেশের প্রথম মেট্রো রেলের সূচনা করেছিল, সেই শহরই এবার আধুনিক ভূগর্ভস্থ প্রকৌশলের আরেকটি অসাধারণ নজির স্থাপন করল। জোকা-এসপ্ল্যানেড মেট্রো করিডরের নির্মাণকাজে ব্যবহৃত অত্যাধুনিক টানেল বোরিং মেশিন (TBM) ‘দুর্গা’ সফলভাবে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল মেট্রো স্টেশনে পৌঁছেছে। এই ‘ব্রেকথ্রু’ শুধু একটি নির্মাণ-পর্বের সমাপ্তি নয়, বরং কলকাতার ভবিষ্যৎ পরিবহণ ব্যবস্থার এক যুগান্তকারী অধ্যায়ের সূচনা।
শহরের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী এবং সংবেদনশীল এলাকা ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের নিচ দিয়ে সুড়ঙ্গ নির্মাণকে শুরু থেকেই অত্যন্ত কঠিন প্রকৌশলগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছিল। শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহাসিক স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত রেখে, ভূগর্ভস্থ নানা ধরনের মাটি, জলস্তর ও অন্যান্য প্রতিবন্ধকতার মধ্যে দিয়ে বিশাল আকৃতির টানেল বোরিং মেশিন চালিয়ে নির্ভুলভাবে নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছনো সহজ কাজ নয়। সেই কঠিন পরীক্ষাতেই সাফল্যের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়েছে TBM ‘দুর্গা’।
‘দুর্গা’র এই সফল যাত্রা ভারতীয় প্রকৌশলীদের দক্ষতা, পরিকল্পনা এবং আধুনিক প্রযুক্তির অসাধারণ সমন্বয়ের প্রতীক। খিদিরপুর প্রান্ত থেকে যাত্রা শুরু করে প্রায় ১.৭ কিলোমিটার দীর্ঘ ভূগর্ভস্থ পথ অতিক্রম করে এটি ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল মেট্রো স্টেশনে পৌঁছেছে। এই সময় হাজার হাজার প্রি-কাস্ট কংক্রিট সেগমেন্ট বসিয়ে শক্তিশালী সুড়ঙ্গ তৈরি করা হয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে নিরাপদে মেট্রো চলাচল করতে পারে।
নির্মাণকারী সংস্থা রেল বিকাশ নিগম লিমিটেড (RVNL)-এর তত্ত্বাবধানে এই কাজ সম্পন্ন হয়েছে। পুরো প্রক্রিয়ায় ব্যবহার করা হয়েছে অত্যাধুনিক জিও-টেকনিক্যাল মনিটরিং ব্যবস্থা, গ্রাউন্ড মুভমেন্ট সেন্সর, ভাইব্রেশন মনিটর এবং রিয়েল-টাইম ডেটা বিশ্লেষণ প্রযুক্তি। প্রতিটি মুহূর্তে নজর রাখা হয়েছে যাতে মাটির সামান্যতম নড়াচড়াও ঐতিহাসিক স্থাপনার উপর কোনও প্রভাব না ফেলে। প্রকৌশলীদের মতে, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের মতো সংরক্ষিত ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার নিচ দিয়ে এই ধরনের সুড়ঙ্গ নির্মাণ ভারতের অন্যতম জটিল নগর অবকাঠামো প্রকল্পগুলির মধ্যে একটি।

এই সাফল্যের তাৎপর্য শুধু প্রযুক্তিগত নয়, শহরের ভবিষ্যৎ যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জোকা-এসপ্ল্যানেড মেট্রো করিডর সম্পূর্ণ হলে দক্ষিণ-পশ্চিম কলকাতার বিস্তীর্ণ অংশ সরাসরি শহরের প্রাণকেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত হবে। বর্তমানে জোকা থেকে মাঝেরহাট পর্যন্ত পরিষেবা চালু থাকলেও ভবিষ্যতে খিদিরপুর, ভিক্টোরিয়া, পার্ক স্ট্রিট এবং এসপ্ল্যানেড পর্যন্ত পরিষেবা চালু হলে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ দ্রুত, নিরাপদ ও আরামদায়ক যাতায়াতের সুযোগ পাবেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই করিডর চালু হলে শহরের অন্যতম ব্যস্ত সড়কগুলিতে যানজট উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। পাশাপাশি বাস ও ব্যক্তিগত গাড়ির উপর নির্ভরতা কমায় দূষণও হ্রাস পাবে। ফলে এটি শুধু একটি নতুন মেট্রো লাইন নয়, বরং পরিবেশবান্ধব নগর পরিবহণ ব্যবস্থার দিকেও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
টানেল বোরিং মেশিন বা TBM মূলত একটি বিশালাকৃতির স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র, যা মাটি কেটে এগিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি একই সঙ্গে সুড়ঙ্গের কংক্রিটের আবরণও তৈরি করে। আধুনিক শহরগুলিতে গভীর ভূগর্ভে নিরাপদ ও দ্রুত সুড়ঙ্গ নির্মাণে এই প্রযুক্তির ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। কলকাতার মতো জনবহুল ও ঐতিহ্যবাহী শহরে এই প্রযুক্তির সফল প্রয়োগ ভারতের অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি বড় অর্জন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

মেট্রো কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ‘দুর্গা’ ভিক্টোরিয়া স্টেশনে পৌঁছলেও প্রকল্পের কাজ এখানেই শেষ নয়। পরবর্তী পর্যায়ে পার্ক স্ট্রিট ও এসপ্ল্যানেডের দিকে সুড়ঙ্গ নির্মাণের কাজ এগিয়ে চলবে। পাশাপাশি অপর একটি টানেল বোরিং মেশিন ‘দিব্যা’ সমান্তরাল সুড়ঙ্গ নির্মাণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। দুটি সুড়ঙ্গ সম্পূর্ণ হলে আপ এবং ডাউন—দুই দিকেই মেট্রো চলাচলের পরিকাঠামো তৈরি হবে।
এই প্রকল্প শুধু কলকাতার জন্য নয়, গোটা দেশের নগর অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রেও একটি মডেল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশ্বের বহু উন্নত শহরের মতো কলকাতাও ধীরে ধীরে আরও আধুনিক, দ্রুত এবং পরিবেশবান্ধব গণপরিবহণ ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে চলেছে। আর সেই যাত্রাপথে TBM ‘দুর্গা’-র এই ঐতিহাসিক সাফল্য আগামী দিনের উন্নয়নের ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করল।
ভারতের প্রথম মেট্রো শহর হিসেবে কলকাতা বহুবার দেশের সামনে পথপ্রদর্শকের ভূমিকা নিয়েছে। সেই ঐতিহ্য বজায় রেখেই আজ আবারও প্রমাণ হল—আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ প্রকৌশলী এবং সুপরিকল্পিত বাস্তবায়ন একসঙ্গে কাজ করলে অসম্ভব বলেও কিছু থাকে না। পাতালের অন্ধকার ভেদ করে ‘দুর্গা’ শুধু একটি সুড়ঙ্গই তৈরি করেনি; তৈরি করেছে ভবিষ্যতের কলকাতার আরও দ্রুত, আরও সংযুক্ত এবং আরও আধুনিক এক যাত্রাপথ।
