ফুটবল মানেই ৯০ মিনিটের এক টানটান রোমাঞ্চ—৪৫ মিনিটের দুটি অর্ধ, মাঝে ১৫ মিনিটের বিরতি। দশকের পর দশক ধরে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমী এই চেনা নিয়মেই অভ্যস্ত। কিন্তু আধুনিক কর্পোরেট দুনিয়া এবং স্পোর্টস ব্রডকাস্টিং বা সম্প্রচার স্বত্বের বাজারে ঐতিহ্য বোধহয় সবচেয়ে কম দামি জিনিস। ফুটবল নিয়ামক সংস্থা ফিফা (FIFA) এবার যে নতুন ভাবনাচিন্তা শুরু করেছে, তা বাস্তবায়িত হলে ফুটবলের চিরপরিচিত রূপটাই বদলে যেতে পারে। জানা যাচ্ছে, আমেরিকার বাস্কেটবল লীগ (NBA) কিংবা আমেরিকান ফুটবল লীগের (NFL) ধাঁচে ফুটবল বিশ্বকাপকেও ৪টি কোয়ার্টারে বা চার ভাগে ভাগ করার পরিকল্পনা চলছে। আর এই পরিকল্পনার নেপথ্যে খেলার উন্নতির চেয়ে ‘টেলিভিশন শো’ এবং বিজ্ঞাপনের কোটি কোটি ডলারের হাতছানিই বেশি কাজ করছে বলে মনে করছেন ফুটবল বিশেষজ্ঞরা।

কেন এই পরিবর্তনের ভাবনা?
আমেরিকান খেলা যেমন—এনবিএ বা এনএফএল-এর জনপ্রিয়তার একটা বড় কারণ হলো এর সম্প্রচার শৈলী। সেখানে খেলা বারবার থামে, আর সেই বিরতিতে ব্রডকাস্টাররা মোটা অঙ্কের টাকার বিজ্ঞাপন দেখানোর সুযোগ পায়। বর্তমান ফুটবল নিয়মে ৪৫ মিনিটে খেলা থামা বা বিজ্ঞাপন দেখানোর সুযোগ নেই বললেই চলে। ফিফার যুক্তি, খেলাটিকে যদি চার ভাগে (চারটি ২২ বা ২০ মিনিটের কোয়ার্টার) ভাগ করা যায়, তবে ব্রডকাস্টাররা বিজ্ঞাপনের জন্য অনেক বেশি ‘উইন্ডো’ বা সময় পাবে। এতে সম্প্রচার স্বত্ব থেকে ফিফা ও আয়োজকদের আয় এক ধাক্কায় বহুগুণ বেড়ে যাবে।
ফুটবল বনাম কমার্শিয়াল শো
৫ জুন, ২০২৬-এর আধুনিক ক্রীড়া বিশ্বের দিকে তাকালে বোঝা যায়, ফুটবল এখন আর শুধু মাঠের খেলা নেই, এটি বিলিয়ন ডলারের এক বিশাল ইন্ডাস্ট্রি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, টিকিটের দাম দিয়ে বা টিভির সামনে বসে দর্শকরা কি খেলা দেখতে চান, নাকি বিজ্ঞাপনের বন্যা?
- খেলার গতি ও ছন্দপতন: ফুটবলের মূল সৌন্দর্য হলো এর নিরবচ্ছিন্ন গতি। গতিশীল পাসিং, কাউন্টার অ্যাটাক এবং ট্যাকটিকাল পরিবর্তনের যে ছন্দ ৪৫ মিনিট ধরে বজায় থাকে, তা প্রতি ২০ মিনিট অন্তর ভেঙে দিলে খেলার আকর্ষণটাই নষ্ট হয়ে যাবে।
- খেলোয়াড়দের ওপর প্রভাব: বারবার খেলা থামলে খেলোয়াড়দের শারীরিক ছন্দ ও মনোযোগ নষ্ট হতে পারে। ফুটবলাররা রোবট নন; এনবিএ-র মতো ইনডোর গেমের হাই-ইনটেনসিটি আর ফুটবলের বিশাল মাঠের স্ট্যামিনার মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত রয়েছে।

আমেরিকানাইজেশনের কোপে ফুটবল সংস্কৃতি
২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ যৌথভাবে আয়োজন করছে আমেরিকা, কানাডা এবং মেক্সিকো। স্বাভাবিকভাবেই, এই বিশ্বকাপে আমেরিকার কর্পোরেট সংস্কৃতির একটা বড় প্রভাব রয়েছে। ফিফা যেভাবে ফুটবলকে একটি ‘টিভি শো’-তে রূপান্তরিত করতে চাইছে, তা ফুটবল রোমান্টিকদের হৃদয়ে বড়সড় আঘাত। ঐতিহ্যবাহী ইউরোপীয় ও লাতিন আমেরিকার ফুটবল ক্লাব এবং সমর্থকরা ইতিমধ্যেই এই ধরনের বাণিজ্যিক পরীক্ষানিরীক্ষার বিরুদ্ধে সরব হতে শুরু করেছেন।
উন্নয়ন বা আধুনিকীকরণ স্বাগত, কিন্তু তা যদি খেলার মূল আত্মাকেই বিসর্জন দিয়ে হয়, তবে তা মেনে নেওয়া কঠিন। ফুটবলপ্রেমীরা মাঠে বা টিভিতে বিশুদ্ধ ফুটবল দেখতে আসেন, কোনো রিয়্যালিটি শো বা বিজ্ঞাপনের কোলাজ দেখতে নয়। ফিফা যদি শুধুমাত্র ডলারের লোভে ফুটবলকে এনবিএ বা এনএফএল-এর কার্বন কপি বানাতে চায়, তবে হয়তো স্পনসরদের পকেট ভরবে, কিন্তু ফুটবল তার চিরন্তন আবেগ ও জাদুকরী রূপটি হারিয়ে ফেলবে।
