হায়দরাবাদের এক অনুষ্ঠানে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত বলেছেন, LGBTQ+ সম্প্রদায়ের মানুষ সমাজেরই অংশ। তাঁদের হেয় করা বা সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে রাখা উচিত নয়। তবে তাঁর বক্তব্যে ব্যবহৃত ‘নিরাময়যোগ্য’ শব্দটি আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের স্বীকৃত অবস্থানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
By: Supriya Paul
Updated at : 27 july 2026
LGBTQ+ সম্প্রদায়কে নিয়ে তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করলেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের প্রধান মোহন ভাগবত। রবিবার, ২৬ জুলাই হায়দরাবাদে ‘সমসাময়িক মাতৃত্ব’ বিষয়ক একটি অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, LGBTQ+ ব্যক্তিরা ভারতীয় সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং তাঁদের অবজ্ঞা কিংবা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করা উচিত নয়। অনুষ্ঠানটি আয়োজন করেছিল বিশ্ব মাঙ্গল্য সভা।
ভাগবতের বক্তব্য অনুযায়ী, সমাজে বিভিন্ন ধরনের যৌন অভিমুখিতা ও লিঙ্গপরিচয়ের মানুষ বরাবরই ছিলেন। কিছু মানুষের পরিচয় জন্মগত বা প্রকৃতিনির্ধারিত বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তাঁর কথায়, তাঁরা মানুষ এবং অন্য সবার মতোই মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার তাঁদের রয়েছে।
ভারতীয় ঐতিহ্যের প্রসঙ্গ
আরএসএস প্রধান দাবি করেন, ভারতীয় ঐতিহ্য যৌন ও লিঙ্গবৈচিত্র্যের অস্তিত্বকে অস্বীকার করেনি। তাঁর মতে, ভারতীয় সমাজে এই সম্প্রদায়ের জন্য বরাবরই একটি সামাজিক স্থান ছিল। তাঁদের হীন চোখে দেখা ভারতীয় সংস্কৃতির শিক্ষা নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এই বক্তব্যের সমর্থনে ভাগবত রূপান্তরকামী সম্প্রদায়ের নিজস্ব দেবদেবী, ধর্মীয় স্থান এবং মহামণ্ডলেশ্বরদের প্রসঙ্গ তোলেন। কুম্ভমেলায় তাঁদের অংশগ্রহণকেও ভারতীয় সামাজিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্যে স্বীকৃতির উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
এই প্রথম নয়
LGBTQ+ সম্প্রদায় নিয়ে মোহন ভাগবত এর আগেও একই ধরনের বক্তব্য রেখেছেন। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে আরএসএস-ঘনিষ্ঠ পত্রিকা অর্গানাইজার এবং পাঞ্চজন্য-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, LGBTQ+ ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক পরিসর থাকা প্রয়োজন এবং অন্যদের মতো তাঁদেরও বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে। তিনি তখনও বলেছিলেন, এই সম্প্রদায়ের উপস্থিতি নতুন কোনও বিষয় নয় এবং ভারতীয় সভ্যতায় তাঁদের অস্তিত্ব ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত।
‘নিরাময়যোগ্য’ মন্তব্য ঘিরে প্রশ্ন
তবে সাম্প্রতিক বক্তব্যে ভাগবত বলেন, এই ধরনের কিছু ‘প্রবণতা’ নিরাময়যোগ্য হতে পারে, আবার কিছু নাও হতে পারে। এই শব্দচয়নটি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১৯৯০ সালেই সমকামিতাকে মানসিক রোগের তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে। WHO-র বর্তমান অবস্থান অনুযায়ী, যৌন অভিমুখিতা কোনও রোগ নয়; একইভাবে ICD-11-এ রূপান্তরকামী পরিচয় সম্পর্কিত ‘জেন্ডার ইনকনগ্রুয়েন্স’-কেও মানসিক ব্যাধির বিভাগ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে যৌন অভিমুখিতা বা লিঙ্গপরিচয়কে ‘রোগ’ কিংবা ‘নিরাময়ের বিষয়’ হিসেবে দেখা চিকিৎসাবিজ্ঞানের স্বীকৃত অবস্থানের সঙ্গে মেলে না।
ভারতে আইনি অবস্থান

২০১৮ সালে সুপ্রিম কোর্ট সম্মতিসূচক প্রাপ্তবয়স্ক সমলিঙ্গ সম্পর্ককে অপরাধের আওতা থেকে মুক্ত করে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারার সংশ্লিষ্ট অংশ অসাংবিধানিক বলে ঘোষণা করেছিল। তবে সমলিঙ্গ বিবাহ এখনও ভারতে আইনগত স্বীকৃতি পায়নি। ২০২৩ সালে সুপ্রিম কোর্ট সমলিঙ্গ বিবাহকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়ার দায়িত্ব সংসদ ও সরকারের নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্র বলে জানিয়েছিল।
সব মিলিয়ে, LGBTQ+ ব্যক্তিদের সমাজের অংশ হিসেবে মর্যাদা দেওয়ার পক্ষে ভাগবতের বক্তব্যকে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। একই সঙ্গে তাঁর বক্তব্যে ‘নিরাময়’ সংক্রান্ত শব্দচয়নটি নতুন করে বিতর্ক তৈরি করতে পারে। সামাজিক স্বীকৃতি, সমান নাগরিক অধিকার এবং বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে সামঞ্জস্য রাখাই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
