স্বস্তিতে বইপাড়া – গুজবের মেঘ কাটিয়ে স্বমহিমায় কলেজ স্ট্রিট

রাজ্য জুড়ে চলা সাম্প্রতিক হকার উচ্ছেদ অভিযানের আবহে গত কয়েক দিন ধরেই তীব্র আতঙ্কে ভুগছিল কলকাতার বইপাড়া। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ পুরনো বইয়ের বাজার এবং বাঙালির আবেগের কেন্দ্রস্থল কলেজ স্ট্রিট কি এবার বুলডোজারের কোপে পড়বে? এই প্রশ্নে যখন বই বিক্রেতা থেকে শুরু করে ছাত্রছাত্রী ও সাধারণ মানুষের মনে চরম উদ্বেগ দানা বেঁধেছিল, ঠিক তখনই আশ্বাসের বার্তা দিল কলকাতা পুরসভা (KMC)। বৃহস্পতিবার পুরসভায় আয়োজিত এক সাংবাদিক বৈঠকে পুর-কমিশনার স্মিতা পাণ্ডে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, কলেজ স্ট্রিটে বইয়ের দোকান সরানোর বা হকার উচ্ছেদের কোনও পরিকল্পনাই প্রশাসনের নেই। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে (৫ জুন, ২০২৬) পুরসভার এই ঘোষণায় কার্যত হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে গোটা বইপাড়া।

গুজব এবং ভুয়ো খবরের জাল

গত কয়েকদিন ধরে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে শুরু করে লোকমুখে হু হু করে ছড়িয়ে পড়েছিল বইপাড়া উচ্ছেদের খবর। রটে গিয়েছিল যে, হকারদের দোকান সরানোর জন্য ১৫ দিনের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বৃহস্পতিবারের সাংবাদিক বৈঠকে পুর-কমিশনার এবং কলকাতা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার ডি. পি. সিংহ যৌথভাবে জানান, পুরসভা বা পুলিশের তরফ থেকে এমন কোনও নোটিস জারি করা হয়নি। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, আতঙ্ক ছড়ানোর জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহার করে ভুয়ো নোটিস বা নির্দেশিকা তৈরি করা হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রশাসন। আধুনিক প্রযুক্তির এই অপব্যবহার কীভাবে সাধারণ খেটে-খাওয়া মানুষ এবং নাগরিক সমাজে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে, বইপাড়ার এই ঘটনাই তার জ্বলন্ত উদাহরণ।

বইপাড়া: শুধুই কি ফুটপাত দখল?

হাওড়া বা শিয়ালদহ স্টেশনের বাইরের জবরদখল আর কলেজ স্ট্রিটের বইয়ের স্টলগুলোর মধ্যে একটা মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। বইপাড়া শুধুমাত্র একটি বাণিজ্যিক লেনদেনের জায়গা নয়, এটি বাংলার শিক্ষা ও সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। দশকের পর দশক ধরে নামমাত্র লাভে পড়ুয়াদের হাতে প্রয়োজনীয় রেফারেন্স বই বা পুরনো পাঠ্যবই তুলে দিচ্ছেন এই হকাররা। গ্রামীণ প্রান্ত থেকে আসা বহু ছাত্রছাত্রীর কাছে কলেজ স্ট্রিটের ফুটপাতের এই দোকানগুলোই ভরসা। তাই অন্যান্য জায়গার জবরদখলের সঙ্গে বইপাড়াকে এক আসনে বসিয়ে বিচার করাটা একপ্রকার ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ভুল হতো।

প্রশাসনের প্রশংসনীয় পদক্ষেপ ও আগামী দিনের সতর্কতা

গুজবের কারণে যখন বই বিক্রেতারা নিজেদের জীবিকা হারানোর ভয়ে স্টল ছোট করতে শুরু করেছিলেন বা বিক্রিবাটা প্রায় তলানিতে এসে ঠেকেছিল, তখন প্রশাসনের এই দ্রুত হস্তক্ষেপ অত্যন্ত প্রশংসনীয়। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নির্দেশ মেনে কোনও বিষয়ে তাড়াহুড়ো না করে এবং সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে এগোনোর যে বার্তা দেওয়া হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে, ফুটপাত দিয়ে পথচারীদের হাঁটার অধিকারও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাই হকারদেরও খেয়াল রাখতে হবে যাতে বইয়ের পসরা সাজাতে গিয়ে মূল রাস্তা বা হাঁটার পথ পুরোপুরি অবরুদ্ধ না হয়ে পড়ে।

পরিশেষে, সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে কোনো খবর যাচাই না করে বিশ্বাস করা বা তা ছড়িয়ে দেওয়া থেকে আমাদের সকলকেই বিরত থাকতে হবে। বইপাড়া তার আপন ছন্দেই থাকুক। গুজবের আতঙ্ক সরিয়ে ফের নতুন ও পুরনো বইয়ের গন্ধে ম ম করে উঠুক কলেজ স্ট্রিট—এমনটাই প্রত্যাশা তিলোত্তমাবাসীর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *