১০ জুন, ২০২৬
সম্পাদকীয় কলম
শিক্ষার মন্দির আজ পরিণত হয়েছে যুদ্ধক্ষেত্রে। যেখান থেকে দেশের ভবিষ্যৎ গড়ার কথা, সেখানেই এখন চলছে টাকার অহংকার, পেশিশক্তির আস্ফালন এবং আদিপত্য বিস্তারের নোংরা লড়াই। বিহারের কোচিং দুনিয়ার দুই অত্যন্ত জনপ্রিয় মুখ—খান স্যর এবং রোশন স্যরের সাম্প্রতিক দ্বৈরথ যেন সেই অবক্ষয়েরই এক চরম দৃষ্টান্ত। একসময় যাঁরা ছাত্রদের কাছে ছিলেন ‘আদর্শ’, আজ তাঁরাই একে অপরের চিরশত্রু। কিন্তু কীভাবে শুরু হলো এই শত্রুতা?
সাফল্যের বেচাকেনা: ১০ লক্ষ টাকায় ‘টপার’
প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার বাজারে এখন মূলধন হলো ‘সাকসেস রেট’ বা সাফল্যের হার। যে কোচিং সেন্টারের ব্যানার যত বেশি টপারের হাসিমুখ দিয়ে সাজানো, সেখানে ছাত্র ভর্তির ঢল তত বেশি। আর এই ব্যবসায়িক লোভ থেকেই জন্ম নিয়েছে ‘টপার কেনা’-র মতো ন্যক্কারজনক প্রথা।

অভিযোগ, ১০ লক্ষ টাকার বিপুল অঙ্কের বিনিময়ে এক প্রথম সারির টপারকে নিজেদের মুখ হিসেবে কিনে নেওয়ার চেষ্টা থেকেই খান স্যর এবং রোশন স্যরের মধ্যে বিবাদের সূত্রপাত। একজন শিক্ষক যখন নিজের পড়ানো ছাত্রের মেধার ওপর ভরসা না করে, টাকার জোরে অন্যের সাফল্যকে নিজের বলে দাবি করতে ছোটেন, তখন তা কেবল শিক্ষার অবমাননাই নয়, বরং গোটা ছাত্রসমাজের সঙ্গে এক বিশাল প্রতারণা। এই ঘটনা প্রমাণ করে দেয়, শিক্ষা আজ কতটা পণ্য হয়ে উঠেছে।
ঘর ভাঙানো এবং শিক্ষক চুরির রাজনীতি
টপার কেনার বিতর্ক থামতে না থামতেই শুরু হয় ‘ঘর ভাঙানো’-র খেলা। কর্পোরেট দুনিয়ায় যেমন এক কোম্পানি থেকে অন্য কোম্পানিতে কর্মী ভাঙিয়ে নেওয়ার রেওয়াজ রয়েছে, ঠিক তেমনই শুরু হয় একে অপরের কোচিং সেন্টার থেকে জনপ্রিয় শিক্ষকদের মোটা টাকার প্রলোভন দেখিয়ে নিজেদের দলে টানার লড়াই। রোশন স্যরের শিবির থেকে শিক্ষকদের ভাঙিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে খান স্যরের বিরুদ্ধে, আবার পাল্টা কৌশল হিসেবে একই কাজ শুরু করে বিপক্ষও। ফলস্বরূপ, কোচিং সেন্টারগুলির অন্দরমহলে তৈরি হয় চরম অবিশ্বাস ও অস্থিরতা, যার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হয় সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা।
চক-ডাস্টারের বদলে বোমাবাজি
বিবাদ চরমে পৌঁছায় যখন কলমের বদলে হাতে উঠে আসে বারুদ। দুই শিবিরের অনুগামী এবং ভাড়াটে গুন্ডাদের মধ্যে সংঘর্ষ, কোচিং সেন্টারের সামনে বোমাবাজি এবং ভাঙচুরের ঘটনা প্রমাণ করে দিয়েছে যে এই লড়াই আর শুধু শিক্ষকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন পুরোপুরি মাফিয়া রাজের রূপ নিয়েছে। প্রশাসনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দিনেদুপুরে এই ধরনের সন্ত্রাস এটাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, এই ‘গডম্যান’ শিক্ষকদের পেছনে রয়েছে বিশাল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মদত।
খান স্যর এবং রোশন স্যরের এই লড়াই ব্যক্তি-আক্রোশ হতে পারে, কিন্তু এটি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার গভীরে লুকিয়ে থাকা এক ভয়ানক অসুখের লক্ষণ। যে ছাত্ররা নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে এই শিক্ষকদের কাছে যায়, তারা কী শিখছে? তারা শিখছে—টাকা থাকলে সাফল্য কেনা যায়, আর ক্ষমতা থাকলে আইনকে বুড়ো আঙুল দেখানো যায়।
১০ জুন, ২০২৬-এর এই দাঁড়িয়ে আমাদের প্রশ্ন করা উচিত—আমরা কি এই ধরনের ‘শিক্ষক’-দের হাতে আগামী প্রজন্মের দায়িত্ব তুলে দিতে পারি? অবিলম্বে প্রশাসন ও শিক্ষাদপ্তরের উচিত এই কোচিং মাফিয়াদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ নেওয়া। শিক্ষা বাণিজ্য হতে পারে, কিন্তু তাকে অন্ধকার জগতের মাফিয়াগিরি হতে দেওয়া যায় না। সময় এসেছে এই অসুস্থ প্রতিযোগিতার অবসান ঘটানোর।
