জলতরঙ্গে যোগাভ্যাস: কলকাতার গঙ্গাবক্ষে পাঁচশো তরণী, সাক্ষী রইলেন প্রধানমন্ত্রী

ভারতের প্রাচীনতম ও গৌরবময় ঐতিহ্য ‘যোগবিদ্যা’ আজ আর কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে বা প্রেক্ষাগৃহে সীমাবদ্ধ নেই, তা বিশ্বজনীন। প্রতি বছর ২১ জুন বিশ্ব যোগ দিবসে নানারকম অভিনব উদযাপন আমরা দেখে অভ্যস্ত। কিন্তু ২০২৬ সালের দ্বাদশ আন্তর্জাতিক যোগ দিবসে তিলোত্তমা কলকাতা যা দেখল, তাকে এককথায় ‘অভূতপূর্ব’ ও ঐতিহাসিক বললেও কম বলা হয়। খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর উপস্থিতিতে কলকাতার বুক চিরে বয়ে যাওয়া পুণ্যতোয়া গঙ্গার বুকে যে দৃশ্য তৈরি হলো, তা শুধু এ রাজ্যের ইতিহাসে নয়, বিশ্ব যোগ দিবসের ইতিহাসেও এক স্বর্ণাক্ষরে লেখা অধ্যায় হয়ে থাকবে।

নৌকা বা লঞ্চে চড়ে গঙ্গাভ্রমণ কলকাতার সংস্কৃতির অন্যতম অঙ্গ। কিন্তু সেই চেনা গঙ্গাবক্ষেই যখন পাঁচ শতাধিক (৫০০-রও বেশি) সাজানো নৌযান সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে পড়ে এবং তার ওপর একসঙ্গে হাজারো মানুষ যোগাভ্যাসে লীন হন, তখন তা এক অপার্থিব রূপ ধারণ করে। একদিকে কলকাতার শতাব্দীপ্রাচীন ঘাট ও বহমান গঙ্গা, অন্যদিকে ভোরের আলোয় নৌকার ওপর জলকে সাক্ষী রেখে প্রাণায়াম ও আসনের এই মেলবন্ধন—আধ্যাত্মিকতা এবং আধুনিকতার এক অপূর্ব কোলাজ তৈরি করেছিল।

এই উদযাপনের বিশেষ তাৎপর্য: ১. যোগের বিশ্বজনীনতা ও কলকাতার গুরুত্ব: প্রধানমন্ত্রীর এই কর্মসূচিতে সরাসরি অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে আন্তর্জাতিক স্তরে ভারতের সফট পাওয়ার (Soft Power) বা সাংস্কৃতিক প্রভাব বিস্তারে কলকাতাকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ২. মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের বার্তা: আজকের অতি-ব্যস্ত ও যান্ত্রিক নাগরিক জীবনে যখন মানসিক অবসাদ ও শারীরিক ক্লান্তি বড় ব্যাধি হয়ে উঠছে, তখন নদীর শান্ত পরিবেশে এই সমবেত যোগাভ্যাস মানুষকে প্রকৃতির কাছাকাছি ফেরার বার্তা দেয়। ৩. পর্যটন ও সংস্কৃতির বিকাশ: গঙ্গাবক্ষের এই অভূতপূর্ব কোলাজ বিশ্বমঞ্চে কলকাতার পর্যটন এবং ঐতিহ্যকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেল।

যোগ কোনো ধর্ম বা সম্প্রদায়ের গণ্ডিতে আবদ্ধ নয়; এটি শরীর ও মনের সুস্থিতি বজায় রাখার এক বিজ্ঞানসম্মত জীবনশৈলী। কলকাতার গঙ্গাবক্ষের এই ৫-শতাধিক নৌযানের যোগাভ্যাস কেবল একটি দিনের প্রদর্শন হয়ে না থেকে, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত হোক—এটাই হোক এই ঐতিহাসিক যোগ দিবসের আসল প্রাপ্তি। প্রকৃতির কোলে, নদীর স্রোতকে ছুঁয়ে কলকাতা যে নতুন নজির গড়ল, তা আগামী বহু বছর ধরে বিশ্ববাসীকে অনুপ্রাণিত করবে।

তবে এই বর্ণাঢ্য উদযাপনের আলোর পাশাপাশি কিছু বাস্তবমুখী চিন্তারও অবকাশ থাকে। যোগ দিবসের এই বিপুল উদ্দীপনা যেন কেবল একটি দিনের প্রদর্শনী বা ‘ফটো-অপারেশন’-এ থমকে না যায়। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে বিশ্বজুড়ে যে মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্য সংকট চলছে, তাতে যোগাভ্যাসকে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার অঙ্গ করে তোলা অত্যন্ত জরুরি। স্কুল-কলেজের পাঠ্যক্রম থেকে শুরু করে কর্পোরেট অফিস—সর্বত্রই যোগচর্চাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার সময় এসেছে।

একই সঙ্গে, এই আয়োজন গঙ্গার পরিবেশগত সুরক্ষার বিষয়টিকেও স্মরণ করিয়ে দেয়। যে নদী আমাদের এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী করল, তার পরিচ্ছন্নতা ও নাব্যতা বজায় রাখা আমাদের পরম কর্তব্য। পরিশেষে বলা যায়, কলকাতার গঙ্গাবক্ষে ৫০০ তরণীর এই মহামিলন কেবল একটি রেকর্ড গড়ার অনুষ্ঠান ছিল না; এটি ছিল সুস্থ সমাজ গঠন এবং ভারতীয় দর্শনকে বিশ্বময় ছড়িয়ে দেওয়ার এক বলিষ্ঠ অঙ্গীকার। প্রকৃতির কোলে, নদীর স্রোতকে ছুঁয়ে কলকাতা সংস্কৃতির যে নতুন নজির গড়ল, তা আগামী বহু বছর ধরে বিশ্ববাসীকে সুস্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবনের অনুপ্রেরণা জোগাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *