মিথেন গ্যাসের বিস্ফোরণে নির্মীয়মাণ সুড়ঙ্গে ধস; বিষাক্ত গ্যাস ও কম অক্সিজেনের কারণে ব্যাহত উদ্ধারকাজ, তদন্তে বিশেষ দল
By : Supriya
Updated at : 22 july 2026
সিকিমের নামচি জেলার সামারদুং-ঝোলুঙ্গে এলাকায় নির্মীয়মাণ তিস্তা স্টেজ-৬ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে ভয়াবহ বিপর্যয়ে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০। নামচি জেলা পুলিশের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনার সময় সুড়ঙ্গের ভিতরে থাকা মোট ২৭ জনের মধ্যে দু’জন বাইরে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন। বাকি ২৫ জন সুড়ঙ্গের ভিতরে আটকে পড়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে ২০ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে এবং পাঁচজনকে উদ্ধারের জন্য এখনও অভিযান চলছে।
এই দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উত্তরবঙ্গ। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মৃতদের মধ্যে অন্তত ১১ জন উত্তরবঙ্গের বাসিন্দা। তাঁদের মধ্যে ন’জন জলপাইগুড়ি জেলার এবং দু’জন আলিপুরদুয়ার জেলার বাসিন্দা। এছাড়া নিহতদের মধ্যে পঞ্জাব ও সিকিমের বাসিন্দাও রয়েছেন। মৃতদের পরিচয় শনাক্ত করার পাশাপাশি তাঁদের দেহ পরিবারের হাতে তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।

কীভাবে ঘটল দুর্ঘটনা?
এনএইচপিসির বিবৃতি অনুযায়ী, সোমবার, ২০ জুলাই দুপুর প্রায় ১টা ৪ মিনিটে তিস্তা স্টেজ-৬ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্মীয়মাণ ‘হেড রেস টানেল’-এর ভিতরে দুর্ঘটনাটি ঘটে। প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছে, পাথরের স্তরের মধ্যে আটকে থাকা মিথেন গ্যাস হঠাৎ প্রবল চাপে বেরিয়ে এসে বিস্ফোরণ ঘটায়। বিস্ফোরণের পর সুড়ঙ্গের ভিতরে ঘন ধোঁয়া এবং বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়ে। একই সঙ্গে সুড়ঙ্গের একটি অংশে ধস নামায় ভিতরে থাকা শ্রমিক ও প্রকল্পের আধিকারিকেরা আটকে পড়েন।
বিস্ফোরণের প্রকৃত কারণ এখনও চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত হয়নি। সিকিম সরকার ঘটনার তদন্তে একটি বিশেষ তদন্তকারী দল বা এসআইটি গঠনের ঘোষণা করেছে। এই দল সুড়ঙ্গের নিরাপত্তাব্যবস্থা, গ্যাস শনাক্তকরণ ব্যবস্থা, খনন পদ্ধতি এবং কাজের সময় প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাবিধি যথাযথভাবে মানা হয়েছিল কি না, তা পরীক্ষা করবে। রাসায়নিক বিশেষজ্ঞদের একটি দলও ঘটনাস্থলে পৌঁছে নমুনা সংগ্রহ ও পরিস্থিতি বিশ্লেষণের কাজ শুরু করেছে।
বিষাক্ত গ্যাসে কঠিন হচ্ছে উদ্ধারকাজ
সুড়ঙ্গের ভিতরে মিথেনের পাশাপাশি কার্বন মনোক্সাইড এবং হাইড্রোজেন সালফাইডের মতো বিষাক্ত গ্যাসের উপস্থিতি পাওয়া গিয়েছে। অক্সিজেনের মাত্রাও অত্যন্ত কম। ফলে বিশেষ অক্সিজেন সরঞ্জাম ব্যবহার করেও উদ্ধারকারীরা একটানা বেশিক্ষণ ভিতরে থাকতে পারছেন না। কোনও কোনও পর্যায়ে উদ্ধারকারী দলকে প্রায় ১৫ মিনিট করে কাজ করতে হয়েছে। বিষাক্ত গ্যাসের কারণে কয়েকজন উদ্ধারকর্মী অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বলেও প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে।
উদ্ধার অভিযানে জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী বা এনডিআরএফ, রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী, সিকিম পুলিশ, দমকল ও জরুরি পরিষেবা, সিকিম রাজ্য বিপর্যয় ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ, জেলা প্রশাসন এবং স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকেরা কাজ করছেন। খনি নিরাপত্তা দফতরের বিশেষজ্ঞ উদ্ধারকারী দলও ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে।

ক্ষতিপূরণের ঘোষণা
সিকিমের মুখ্যমন্ত্রী প্রেম সিং তামাং মৃতদের প্রত্যেকের পরিবারকে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে চার লক্ষ টাকা করে আর্থিক সাহায্য এবং আহতদের ৫০ হাজার টাকা করে দেওয়ার ঘোষণা করেছেন। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় ত্রাণ তহবিল থেকে মৃতদের নিকটাত্মীয়দের দু’লক্ষ টাকা এবং আহতদের ৫০ হাজার টাকা করে দেওয়ার ঘোষণা করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সিকিমের মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে উদ্ধারকাজে কেন্দ্রের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।
এই ভয়াবহ বিপর্যয়ের পর পাহাড়ি এলাকায় চলা সুড়ঙ্গ ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলির নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনও সংস্থা বা ব্যক্তির গাফিলতি সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো সম্ভব নয়।
