সুস্থ অবস্থায় মিলল দময়ন্তীর খোঁজ, স্বস্তিতে পরিবার ও বাংলার ক্রীড়ামহল

বাড়ি ফিরল বাংলার প্রতিভাবান শুটার দময়ন্তী, স্বস্তিতে পরিবার ও ক্রীড়ামহল

অবশেষে উৎকণ্ঠার অবসান। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে নিখোঁজ থাকা হাওড়ার প্রতিভাবান রাইফেল শুটার দময়ন্তী সেনকে শনিবার ভোরে সুস্থ অবস্থায় পাওয়া গিয়েছে। হাওড়ার রামকৃষ্ণপুর ঘাট এলাকা থেকে তাকে পাওয়া যায় বলে জানিয়েছেন পরিবারের সদস্যেরা। দময়ন্তীর কোচ তথা অর্জুন পুরস্কারপ্রাপ্ত অলিম্পিয়ান শুটার জয়দীপ কর্মকারও সমাজমাধ্যমে তাঁর ছাত্রীকে সুস্থ অবস্থায় পাওয়ার খবর নিশ্চিত করেছেন।

১৫ বছর বয়সি দময়ন্তী মধ্য হাওড়ার উমাচরণ ভট্টাচার্য লেনের বাসিন্দা। সে রাজ্যস্তরের একজন প্রতিভাবান রাইফেল শুটার এবং সম্প্রতি জাতীয় দলের ট্রায়ালে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছিল। বৃহস্পতিবার সকালে বাড়ির কাছের দোকান থেকে প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনতে বেরিয়েছিল সে। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও বাড়ি না ফেরায় পরিবারের সদস্যেরা খোঁজাখুঁজি শুরু করেন এবং পরে থানায় নিখোঁজ ডায়েরি করা হয়।

তদন্তে হাওড়া স্টেশনের সিসিটিভি ফুটেজে দময়ন্তীকে দেখা যায়। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা নাগাদ হাওড়া স্টেশনের ৪ ও ৫ নম্বর প্ল্যাটফর্মের কাছে তার উপস্থিতি ধরা পড়েছিল। বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় সে মোবাইল ফোন সঙ্গে নেয়নি। ফলে তার গতিবিধি অনুসরণ করতে তদন্তকারীদের সমস্যায় পড়তে হয়েছিল। দময়ন্তীকে খুঁজে বার করতে হাওড়া সিটি পুলিশের চারটি দল গঠন করা হয় এবং রেল পুলিশের সহযোগিতায় বিভিন্ন এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করা হচ্ছিল।

Shooter From Bengal Damayanti Sen

পরিবারের তরফে দময়ন্তীর ছবি এবং প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে সমাজমাধ্যমে আবেদন জানানো হয়েছিল। দ্রুত সেই আবেদন ছড়িয়ে পড়ে এবং অসংখ্য মানুষ পোস্টটি শেয়ার করেন। রাজ্যের ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী ইন্দ্রনীল খাঁর সঙ্গেও দেখা করেছিলেন দময়ন্তীর বাবা ধ্রুবজ্যোতি সেন। প্রশাসনের তরফে তাঁকে প্রয়োজনীয় সাহায্যের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল।

শনিবার ভোরে রামকৃষ্ণপুর ঘাটের আশপাশের কয়েকজন দময়ন্তীকে দেখতে পান বলে পরিবার সূত্রে খবর। তাঁরাই পরিবারের সদস্যদের বিষয়টি জানান। পরে পরিবারের লোকজন সেখানে পৌঁছে তাকে বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে যান। দময়ন্তী শারীরিকভাবে সুস্থ রয়েছে বলে জানিয়েছেন তার মা এবং কোচ।

তবে বৃহস্পতিবার বাড়ি থেকে বেরোনোর পর দময়ন্তী কোথায় ছিল, কেন সে বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ করেনি এবং কীভাবে রামকৃষ্ণপুর ঘাটে পৌঁছল—এই প্রশ্নগুলির উত্তর এখনও প্রকাশ্যে আসেনি। পরিবারের সদস্যেরা জানিয়েছেন, মেয়েকে সুস্থ অবস্থায় ফিরে পাওয়াই এই মুহূর্তে তাঁদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। দময়ন্তীর বক্তব্য জেনে তার গতিবিধি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়ার চেষ্টা করছে পুলিশ।

দময়ন্তীকে সুস্থ অবস্থায় ফিরে পাওয়ার খবর নিঃসন্দেহে তার পরিবার, কোচ, সহ-খেলোয়াড় এবং বাংলার ক্রীড়াপ্রেমীদের কাছে বিরাট স্বস্তির। সম্ভাবনাময় একজন কিশোরী খেলোয়াড়ের হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার ঘটনায় যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল, তার আপাত অবসান হয়েছে। এই সাফল্যের পিছনে পুলিশের অনুসন্ধান, পরিবারের নিরন্তর চেষ্টা এবং সাধারণ মানুষের সক্রিয় সহযোগিতার ভূমিকা রয়েছে।

বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য সমাজমাধ্যমের ইতিবাচক ভূমিকা। নিখোঁজ ব্যক্তির ছবি এবং নির্ভরযোগ্য তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে অনুসন্ধান সহজ হতে পারে—দময়ন্তীর ঘটনা আবারও তার প্রমাণ দিল। কিন্তু একই সঙ্গে যাচাই না করা তথ্য, গুজব এবং মনগড়া তত্ত্ব প্রচারের ঝুঁকিও থাকে। অনুসন্ধান চলাকালীন দময়ন্তীকে বিভিন্ন জায়গায় দেখা গিয়েছে বলে একাধিক খবর ছড়ালেও সব তথ্য নির্ভরযোগ্য ছিল না। তাই এই ধরনের ঘটনায় দায়িত্বশীলভাবে তথ্য প্রচার করা অত্যন্ত জরুরি।

এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল দময়ন্তীর মানসিক ও শারীরিক সুস্থতা নিশ্চিত করা। সে নাবালিকা। ফলে কোথায় ছিল বা কেন বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল—তা নিয়ে প্রকাশ্যে জল্পনা, চরিত্রহনন কিংবা ব্যক্তিগত তথ্য প্রচার কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তদন্তের প্রয়োজন অবশ্যই রয়েছে, কিন্তু সেই তদন্ত হতে হবে সংবেদনশীল এবং শিশুর মর্যাদা ও গোপনীয়তা রক্ষা করে।

একজন কিশোরী খেলোয়াড়ের উপর পড়াশোনা, প্রশিক্ষণ, প্রতিযোগিতা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে কতটা চাপ রয়েছে, সেই দিকটিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। তবে নির্দিষ্ট তথ্য না পাওয়া পর্যন্ত দময়ন্তীর নিখোঁজ হওয়ার সঙ্গে মানসিক চাপ, পারিবারিক সমস্যা কিংবা অন্য কোনও কারণকে যুক্ত করা দায়িত্বজ্ঞানহীন হবে।

এই ঘটনার পর পরিবার, কোচিং প্রতিষ্ঠান এবং ক্রীড়া প্রশাসনেরও কিছু শিক্ষা নেওয়া প্রয়োজন। অপ্রাপ্তবয়স্ক খেলোয়াড়দের নিরাপদ যাতায়াত, জরুরি যোগাযোগব্যবস্থা এবং মানসিক সহায়তার জন্য সুস্পষ্ট ব্যবস্থা থাকা দরকার। প্রতিভা বিকাশের পাশাপাশি কিশোর-কিশোরীদের কথা শোনা এবং তাদের মানসিক অবস্থার প্রতি নজর রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

দময়ন্তীকে ফিরে পাওয়ার আনন্দের মধ্যেই তাই সংযম বজায় রাখতে হবে। তাকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে সময় দিতে হবে এবং প্রয়োজন হলে পেশাদার সহায়তা দিতে হবে। খবরের কেন্দ্রবিন্দুতে কোনও রহস্য বা চাঞ্চল্য নয়—এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় সংবাদ, বাংলার সম্ভাবনাময় শুটার নিরাপদে রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *