কঠিন অঙ্ক কষেই জাতীয় পুরস্কার আনল বাংলার ৩ খুদে, সাফল্যের আনন্দে ভাসছে টলিউড

সৌরভ পালোধী পরিচালিত ‘অঙ্ক কি কঠিন’-এর ঋদ্ধিমান বন্দ্যোপাধ্যায়, তপোময় দেব ও গীতশ্রী চক্রবর্তী পেল সেরা শিশুশিল্পীর জাতীয় সম্মান।

By: Supriya

Updated at: 20 jul 2026

জীবনের কঠিন অঙ্ককে সহজ করে দেখানোর গল্প এবার পৌঁছে গেল দেশের সর্বোচ্চ চলচ্চিত্র সম্মানের মঞ্চে। ২০২৪ সালের চলচ্চিত্রগুলির জন্য ঘোষিত ৭২তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ‘অঙ্ক কি কঠিন’ ছবির তিন শিশুশিল্পী ঋদ্ধিমান বন্দ্যোপাধ্যায়, তপোময় দেব এবং গীতশ্রী চক্রবর্তী সেরা শিশুশিল্পী বিভাগে যৌথভাবে সম্মানিত হয়েছে। কেন্দ্রীয় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রকের প্রকাশিত সরকারি তালিকাতেও তিন খুদের নাম রয়েছে।

তবে তথ্যের স্বার্থে উল্লেখ করা প্রয়োজন, সেরা শিশুশিল্পীর পুরস্কারটি শুধু বাংলা ছবির তিন শিল্পীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ‘মিথ্যা’ ছবির অতীশ এস শেট্টি এবং তেলুগু ছবি ‘৩৫—চিন্না কথা কাদু’-র অরুণদেব পোথুলাও একই বিভাগে পুরস্কৃত হয়েছে। বিভাগটির জন্য রজত কমল এবং মোট দুই লক্ষ টাকার অর্থপুরস্কার ভাগ করে দেওয়ার কথা জানিয়েছে সরকারি তালিকা।

তিন শিশুর স্বপ্ন আর লড়াইয়ের গল্প

জাতীয় পুরস্কারের সম্মানে উজ্জ্বল ‘অঙ্ক কি কঠিন’-এর তিন খুদে শিল্পী, আনন্দে ভাসছে বাংলা চলচ্চিত্রজগৎ।

সৌরভ পালোধী পরিচালিত এবং রানা সরকার প্রযোজিত ‘অঙ্ক কি কঠিন’-এর গল্প আবর্তিত হয়েছে কলকাতার ঝাঁ-চকচকে বহুতলের ছায়ায় বড় হয়ে ওঠা তিন শিশু—বাবিন, ডলি ও টায়ারকে ঘিরে। বাবিনের চরিত্রে ঋদ্ধিমান, ডলির ভূমিকায় গীতশ্রী এবং টায়ারের চরিত্রে অভিনয় করেছে তপোময়। তিনজনই একটি জরাজীর্ণ সরকারি স্কুলের পড়ুয়া। বাবিন বড় হয়ে ডাক্তার, ডলি নার্স এবং টায়ার ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন দেখে।

কোভিড অতিমারির ধাক্কায় স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরেও তাদের স্বপ্ন থেমে থাকে না। একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে নিজেদের মতো করে হাসপাতাল তৈরি করার কাজে নেমে পড়ে তিন বন্ধু। কুড়িয়ে পাওয়া সামগ্রী, জোড়াতালি দেওয়া আসবাব এবং সীমিত ক্ষমতা দিয়েই তারা গড়ে তোলে নিজেদের স্বপ্নের জগৎ। শিশুদের চোখ দিয়ে দারিদ্র্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কথাই তুলে ধরেছে ছবিটি।

ছবিতে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছেন পার্নো মিত্র, প্রসূন সোম, উষসী চক্রবর্তী এবং শঙ্কর দেবনাথ-সহ একাধিক শিল্পী। তবে গল্পের প্রধান শক্তি তিন শিশুর স্বপ্ন, বন্ধুত্ব এবং জীবনকে বদলে দেওয়ার অদম্য ইচ্ছা।

উচ্ছ্বসিত পরিচালক ও প্রযোজক

জাতীয় পুরস্কারের খবর প্রকাশ্যে আসার পর আবেগ ধরে রাখতে পারেননি পরিচালক সৌরভ পালোধী। তিনি জানিয়েছেন, তিন শিশুশিল্পী তখনও হয়তো এই সম্মানের প্রকৃত গুরুত্ব পুরোপুরি বুঝতে পারছে না; বড় হলে তারা এর মাহাত্ম্য উপলব্ধি করবে। পরিচালক আরও জানান, শুরু থেকেই তিনি অভিনয়ের পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকা শিশুদের খুঁজছিলেন, যাতে চরিত্র অনুযায়ী তাদের প্রস্তুত করা যায়।

সমাজমাধ্যমে তিন শিশুর ছবি প্রকাশ করে সৌরভ লেখেন, তাদের স্কুলব্যাগে বই-খাতার পাশাপাশি এবার একটি করে জাতীয় পুরস্কারও জমা হলো। প্রযোজক রানা সরকারও ঋদ্ধিমান, তপোময় ও গীতশ্রীকে অভিনন্দন জানিয়ে এই সাফল্যকে বাংলা সিনেমার জয় হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

শুভেচ্ছায় ভাসছে টলিউড

তিন খুদের সাফল্যে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন টলিউডের একাধিক পরিচিত মুখ। অভিনেতা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় ঋদ্ধিমান, তপোময় এবং গীতশ্রীকে অভিনন্দন জানিয়ে তাঁদের সহজ ও নিষ্পাপ অভিনয়ের প্রশংসা করেছেন। একই সঙ্গে অঞ্জন দত্ত পরিচালিত ‘চালচিত্র এখন’-এর সেরা বাংলা চলচ্চিত্রের জাতীয় পুরস্কার জয়ের জন্যও অভিনন্দন জানিয়েছেন তিনি।

সরকারি তালিকা অনুযায়ী, ৭২তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ‘চালচিত্র এখন’ সেরা বাংলা চলচ্চিত্র নির্বাচিত হয়েছে। ফলে একদিকে অঞ্জন দত্তের ছবির সম্মান, অন্যদিকে ‘অঙ্ক কি কঠিন’-এর তিন নবীন শিল্পীর স্বীকৃতি—দুই প্রজন্মের সাফল্যে উচ্ছ্বসিত বাংলা চলচ্চিত্রমহল।

বড় তারকা, বিপুল বাজেট অথবা ঝাঁ-চকচকে আয়োজন নয়—সাধারণ মানুষের জীবন, তিনটি শিশুর স্বপ্ন এবং মানবিক গল্পই শেষ পর্যন্ত ‘অঙ্ক কি কঠিন’-কে জাতীয় মঞ্চে পৌঁছে দিল। এই স্বীকৃতি শুধু তিন শিশুশিল্পীর ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বাংলা সিনেমার আগামী প্রজন্মের জন্যও এক বড় অনুপ্রেরণা।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *