সবুজ জ্বালানির পথে নতুন প্রশ্ন।
E20 পেট্রোলে ভুটানের আপত্তি ভাবাচ্ছে।
By: Paushali Saha
বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ক্রমশ প্রকট হচ্ছে। কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা হ্রাস করতে বিভিন্ন দেশ বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। সেই প্রচেষ্টারই অংশ হিসেবে ভারত গত কয়েক বছরে ইথানল মিশ্রিত E20 পেট্রোলের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। সরকারের মতে, এই উদ্যোগের মাধ্যমে একদিকে যেমন অপরিশোধিত তেল আমদানির ওপর নির্ভরতা কমবে, তেমনি আখ ও অন্যান্য কৃষিজ ফসল থেকে উৎপাদিত ইথানলের ব্যবহার বাড়িয়ে কৃষকদেরও আর্থিকভাবে লাভবান করা সম্ভব হবে।
কিন্তু সম্প্রতি প্রতিবেশী দেশ ভুটান ভারতের কাছ থেকে E20 পেট্রোল আমদানি করতে আপত্তি জানিয়েছে। কারণ হিসেবে তারা বলেছে, তাদের বর্তমান জ্বালানি সংরক্ষণ ও সরবরাহ ব্যবস্থা এই ধরনের জ্বালানির জন্য এখনও প্রস্তুত নয়। এই ঘটনাটি শুধু একটি বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং এটি সবুজ জ্বালানির প্রসারে বাস্তব অবকাঠামোর গুরুত্বকে সামনে নিয়ে এসেছে।

E20 পেট্রোলে ২০ শতাংশ ইথানল এবং ৮০ শতাংশ পেট্রোল থাকে। ইথানল তুলনামূলকভাবে পরিবেশবান্ধব হলেও এর কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এটি বাতাস থেকে সহজেই আর্দ্রতা শোষণ করতে পারে। যদি সংরক্ষণ ট্যাঙ্ক বা পাইপলাইন পুরোনো হয় অথবা সেগুলি ইথানল-সহনশীল উপাদানে তৈরি না হয়, তাহলে জ্বালানির গুণগত মান নষ্ট হতে পারে। দীর্ঘদিন ব্যবহৃত ধাতব ট্যাঙ্কে ক্ষয়, পানির মিশ্রণ এবং জ্বালানির কার্যকারিতা কমে যাওয়ার ঝুঁকিও থাকে। ভুটানের দাবি, তাদের বিদ্যমান অবকাঠামো এই ঝুঁকি সামলানোর মতো পর্যাপ্তভাবে উন্নত নয়।
ভুটানের এই অবস্থানকে অনেকেই ভারতের নীতির প্রতি অনাস্থা হিসেবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু বিষয়টি সেইভাবে দেখলে ভুল হবে। প্রতিটি দেশের অর্থনৈতিক সামর্থ্য, ভৌগোলিক অবস্থান, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং জ্বালানি অবকাঠামো এক নয়। ভারত গত কয়েক বছরে ধাপে ধাপে E20 জ্বালানির জন্য রিফাইনারি, তেল বিপণন সংস্থা, পরিবহন ব্যবস্থা এবং পাম্পগুলিকে প্রস্তুত করেছে। পাশাপাশি নতুন যানবাহন নির্মাতারাও ধীরে ধীরে E20-উপযোগী ইঞ্জিন বাজারে আনছে। ভুটানের মতো ছোট অর্থনীতির পক্ষে একই গতিতে সেই পরিবর্তন আনা সহজ নয়।

এই ঘটনা ভারতের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে জ্বালানি সহযোগিতা আরও শক্তিশালী করতে হলে শুধু জ্বালানি রপ্তানি করাই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন প্রযুক্তিগত সহযোগিতা, অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ, প্রশিক্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত পরিকল্পনা। ভারত যদি দক্ষিণ এশিয়ায় সবুজ জ্বালানির নেতৃত্ব দিতে চায়, তবে অংশীদার দেশগুলোর বাস্তব চাহিদা এবং সীমাবদ্ধতাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
অন্যদিকে, E20 পেট্রোল নিয়েও এখনও বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে। বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করেন, নতুন প্রজন্মের E20-সামঞ্জস্যপূর্ণ যানবাহনের ক্ষেত্রে সমস্যা কম হলেও পুরোনো গাড়িতে দীর্ঘমেয়াদে কর্মক্ষমতা, জ্বালানি দক্ষতা এবং রাবার বা প্লাস্টিকের কিছু যন্ত্রাংশের ওপর প্রভাব নিয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। তাই নীতি বাস্তবায়নের পাশাপাশি গ্রাহকদের সচেতন করা, যানবাহনের প্রস্তুতি নিশ্চিত করা এবং প্রযুক্তিগত মান বজায় রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সবুজ জ্বালানির ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। বিশ্বজুড়ে কার্বন নিরপেক্ষ অর্থনীতির দিকে অগ্রসর হতে হলে ইথানল, বৈদ্যুতিক যান, বায়োফুয়েল, হাইড্রোজেনসহ একাধিক বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। তবে প্রযুক্তি গ্রহণের ক্ষেত্রে বাস্তব পরিস্থিতি, অবকাঠামো, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং নিরাপত্তাকে উপেক্ষা করলে সেই উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে না।
ভুটানের সিদ্ধান্ত তাই কোনও দেশের সাফল্য বা ব্যর্থতার প্রতীক নয়; বরং এটি একটি বাস্তবতার প্রতিফলন। সবুজ জ্বালানির পথে এগোতে হলে কেবল উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করলেই চলবে না। সেই লক্ষ্য পূরণে প্রয়োজন বিজ্ঞানসম্মত পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত অবকাঠামো, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের কৌশল। পরিবেশ রক্ষার লড়াইয়ে আবেগ যেমন জরুরি, তেমনি জরুরি বাস্তবতার মাটিতে দাঁড়িয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা। আর ভুটানের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত সেই বাস্তবতার দিকেই আমাদের নতুন করে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
