NEET আন্দোলন মামলায় ১৬ অভিযুক্তের জামিন: আইনের শাসন, গণতান্ত্রিক অধিকার ও প্রশাসনিক দায়বদ্ধতার নতুন পরীক্ষা

By : Supriya

Updated at : 29 july 2026

গণতন্ত্রে প্রতিবাদ নাগরিকের মৌলিক অধিকার। তবে সেই প্রতিবাদ যদি সহিংসতায় রূপ নেয়, তাহলে রাষ্ট্রের দায়িত্ব আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখা। আবার আইন প্রয়োগের নামে যদি অযৌক্তিকভাবে গ্রেফতার বা অপ্রয়োজনীয় হেফাজতের অভিযোগ ওঠে, তাহলে বিচারব্যবস্থার ভূমিকা হয়ে ওঠে আরও গুরুত্বপূর্ণ। কলকাতায় NEET-সংক্রান্ত বিক্ষোভে গ্রেফতার হওয়া ১৬ জন অভিযুক্তকে জামিন দেওয়ার সাম্প্রতিক আদালতের সিদ্ধান্ত সেই জটিল ভারসাম্যেরই একটি বাস্তব উদাহরণ।

ঘটনার সূত্রপাত NEET পরীক্ষা নিয়ে অনিয়ম ও প্রশ্নফাঁসের অভিযোগকে কেন্দ্র করে আয়োজিত একটি বিক্ষোভকে ঘিরে। বিক্ষোভ চলাকালীন উত্তেজনা ছড়ায়, পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তি, সরকারি সম্পত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ এবং কয়েকজন সাংবাদিকের উপর হামলার ঘটনাও সামনে আসে। এরপর কলকাতা পুলিশ একাধিক ধারায় মামলা রুজু করে এবং ১৬ জনকে গ্রেফতার করে।

মঙ্গলবার অভিযুক্তদের আদালতে তোলা হলে প্রথমে বিচারবিভাগীয় হেফাজতের নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই পুনরায় শুনানিতে আদালত তাঁদের জামিন মঞ্জুর করে। এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে রাজনৈতিক ও আইনি মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।

তবে এখানে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে বোঝা জরুরি—জামিন মানেই অভিযুক্ত নির্দোষ নন, আবার গ্রেফতার হওয়া মানেই দোষীও নন। ভারতীয় বিচারব্যবস্থায় “Bail is the rule, Jail is the exception” নীতি বহুবার উচ্চ আদালত পুনর্ব্যক্ত করেছে। অর্থাৎ তদন্ত চলাকালীন কোনও ব্যক্তিকে অনির্দিষ্ট সময় হেফাজতে রাখার পরিবর্তে, প্রয়োজনীয় শর্তে জামিন দেওয়াই সাধারণ নীতি, যদি তদন্তে প্রভাব ফেলার বা পলাতক হওয়ার আশঙ্কা না থাকে।

এই মামলায় আদালতের সিদ্ধান্ত সেই সাংবিধানিক নীতিরই প্রতিফলন হিসেবে দেখা যেতে পারে। একই সঙ্গে আদালত কোথাও তদন্ত বন্ধ করার নির্দেশ দেয়নি। ফলে পুলিশের তদন্ত, সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহ এবং আইনি প্রক্রিয়া স্বাভাবিকভাবেই চলবে।

এখানেই প্রশাসনের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। যদি সত্যিই সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর, সাংবাদিকদের উপর হামলা বা পুলিশকে আক্রমণের মতো ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে দোষীদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত ও উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। অন্যদিকে, শুধুমাত্র প্রতিবাদে অংশগ্রহণের কারণে কাউকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে অভিযুক্ত করা হলে, সেটিও আইনের শাসনের পরিপন্থী।

এই ঘটনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে এসেছে—সাংবাদিকদের নিরাপত্তা। যে কোনও আন্দোলন বা বিক্ষোভে সংবাদ সংগ্রহে থাকা সাংবাদিকদের উপর হামলা কেবল ব্যক্তি আক্রমণ নয়; এটি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার উপরও আঘাত। এ ধরনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

NEET-কে ঘিরে বিতর্ক নতুন নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রশ্নফাঁস, পরীক্ষা পরিচালনার স্বচ্ছতা এবং শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দেশজুড়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাই এই আন্দোলনের সামাজিক ভিত্তি যেমন বাস্তব, তেমনই আন্দোলনের চরিত্রও শান্তিপূর্ণ থাকা জরুরি। গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের শক্তি কখনও সহিংসতায় নয়; বরং যুক্তি, সংগঠন এবং সাংবিধানিক পদ্ধতিতে।

রাজনৈতিক দলগুলোরও আত্মসমালোচনা প্রয়োজন। আন্দোলনকে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার অস্ত্র বানালে প্রকৃত সমস্যাগুলো আড়ালে চলে যায়। শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার, পরীক্ষার স্বচ্ছতা এবং শিক্ষার্থীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার মতো মৌলিক প্রশ্নগুলিই হওয়া উচিত আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

কলকাতা আদালতের সাম্প্রতিক জামিনের সিদ্ধান্ত তাই কেবল একটি মামলার আইনি মোড় নয়; এটি আমাদের বিচারব্যবস্থার একটি মৌলিক বার্তাও স্মরণ করিয়ে দেয়—আইন কাউকে আগেভাগে অপরাধী ঘোষণা করে না, আবার আইনের ঊর্ধ্বেও কাউকে স্থান দেয় না।

তদন্ত শেষ হওয়ার পর আদালতেই নির্ধারিত হবে কে দোষী এবং কে নির্দোষ। ততদিন পর্যন্ত প্রশাসনের উচিত নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা, আর সমাজের উচিত বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা রাখা। কারণ গণতন্ত্রে আইনের শাসন তখনই শক্তিশালী হয়, যখন নাগরিকের অধিকার এবং আইনের প্রয়োগ—দুটিই সমান গুরুত্ব পায়।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *