উন্নয়নের বুলডোজ়ার বনাম রুটিরুজির অধিকার: যাদবপুর কোন দিশা দেখাচ্ছে?

যাদবপুর স্টেশন চত্বরে রবিবার গভীর রাতে বুলডোজ়ার ঘিরে যে সংঘাত ও উত্তেজনার ছবি সামনে এল, তা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন উচ্ছেদ অভিযান নয়; বরং তা আমাদের আধুনিক নগরোন্নয়ন, আইনের শাসন এবং প্রান্তিক মানুষের জীবিকার অধিকারের মধ্যে চলতে থাকা দীর্ঘকালীন এক সামাজিক দ্বন্দের প্রতিচ্ছবি। রেল কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনের যৌথ অভিযানে বহু হকারের দোকান ভেঙে দেওয়া হয়েছে, যার প্রতিবাদে নেমেছেন বাম-কংগ্রেস কর্মী-সমর্থকেরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের লাঠিচার্জ, একাধিক ব্যক্তির আহত হওয়া এবং সৃজন ভট্টাচার্য সহ রাজনৈতিক নেতৃত্বকে আটক করার ঘটনা প্রমাণ করে— ক্ষতটি কেবল পরিকাঠামোগত নয়, গভীর রাজনৈতিক ও সামাজিকও।

উন্নয়ন না জীবিকার সংকট? যাদবপুরের ঘটনাকে ঘিরে তীব্র বিতর্ক।
Source: Anandabazer.com

প্রশাসনের পক্ষে যুক্তিটি চেনা এবং আইনিভাবে স্পষ্ট। রেল ও জনপরিসরের জমি দখলমুক্ত করা, যাত্রী চলাচল সুগম করা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নগরোন্নয়নের স্বার্থেই জরুরি। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আজ এই একই যুক্তি ও সক্রিয়তায় বেআইনি দখল হঠানোর কাজ চলছে। কিন্তু প্রশ্নটি আইনের শুষ্ক ধারা নিয়ে নয়, প্রশ্নটি জীবন ও জীবিকার। যাঁদের দোকান ভাঙা হলো, তাঁরা বছরের পর বছর ধরে ওই এলাকায় বৈধ বা অবৈধভাবে ব্যবসা করে ডাল-ভাতের সংস্থান করছিলেন। উচ্ছেদ যদি করতেই হয়, তবে পুনর্বাসনের স্পষ্ট এবং মানবিক রূপরেখা থাকবে না কেন? সুপ্রিম কোর্টের একাধিক পর্যবেক্ষণ এবং হকার নীতিতে বারবার বলা হয়েছে— পুনর্বাসন ও জীবিকার বিকল্প ব্যবস্থা না করে এভাবে উচ্ছেদ করা যায় না।

“উন্নয়ন কখনও কেবল বুলডোজ়ারের পেশিশক্তিতে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না; তার বুনিয়াদের জন্য প্রয়োজন মানবিকতা, স্বচ্ছতা এবং পুনর্বাসনের সুস্পষ্ট নীলনকশা।”

কয়েক দিন আগেই যাদবপুরে এই একই আশঙ্কায় উত্তেজনা ছড়িয়েছিল এবং প্রতিবাদের মুখে প্রশাসনকে পিছু হটতে হয়েছিল। তা সত্ত্বেও রবিবার মধ্যরাতের এই আকস্মিক অভিযান প্রমাণ করে যে, প্রশাসন ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মধ্যে আস্থার সংকট কতটা গভীর। একটি আধুনিক শহরকে পরিচ্ছন্ন, শৃঙ্খলিত এবং যানজটমুক্ত হতেই হবে— এ বিষয়ে কোনো দ্বিমত নেই। কিন্তু সেই শহরকে ‘সুন্দর’ করার খেসারত যদি দিতে হয় হাজারো নিম্নবিত্ত পরিবারের রুটিরুজি কেড়ে নিয়ে, তবে সেই উন্নয়নের সংজ্ঞা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। যে উন্নয়ন একদল নাগরিককে বাস্তুচ্যুত বা কর্মহীন করে, তা সামগ্রিক কল্যাণ আনতে পারে না।

বুলডোজ়ারের সামনে প্রতিবাদ, যাদবপুরে উত্তপ্ত উচ্ছেদ অভিযান
Source: Anandabzar.com

যাদবপুরের ঘটনাটি তাই কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দলের লাভ-ক্ষতির গণ্ডি ছাড়িয়ে আমাদের এক বৃহত্তর সামাজিক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। শহরকে গুছিয়ে তোলার আইনি দায়িত্ব যেমন প্রশাসনের, তেমনই রাষ্ট্রের প্রান্তিক মানুষের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করাও কল্যাণকামী সরকারেরই সাংবিধানিক দায়বদ্ধতা। আইন এবং মানবিকতার মধ্যে এই ভারসাম্য খুঁজে পাওয়াটাই আজ একবিংশ শতাব্দীর নগরোন্নয়নের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

বুলডোজ়ার হয়তো কয়েক ঘণ্টার মধ্যে একটা আস্ত বাজার ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে পারে, সাফ করে দিতে পারে ফুটপাথ। কিন্তু সেই ভাঙনের অভিঘাত ও অনিশ্চয়তা বহু পরিবারকে বছরের পর বছর বহন করতে হয়। যাদবপুরের রবিবাসরীয় রাত সেই রূঢ় ও নির্মম বাস্তবতাকেই আবার আমাদের সামনে এনে দাঁড় করাল। প্রশাসন কি কেবলই আইনের যান্ত্রিক প্রয়োগ করবে, নাকি পুনর্বাসনের মানবিক হাত বাড়িয়ে দেবে— উত্তর লুকিয়ে আছে আগামী দিনগুলোর রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *